নিজেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে চীন নিঃশব্দে রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞা-বিধ্বস্ত অর্থনীতি থেকে। যুদ্ধ শুরুর আগে, দুই দেশ গত মাসে ঘোষণা করেছিল যে তাদের বন্ধুত্বের “কোন সীমা নেই”। এখন, রাশিয়ার অর্থনীতি সারা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে, এই পরিস্থিতিতে চীনের তার আস্থাভাজন প্রতিবেশীকে সাহায্য করার ইচ্ছা এবং ক্ষমতা দুটোই সীমিত হতে পারে। বেইজিং ইউক্রেনের উপর রাশিয়ার হামলার নিন্দা করতে অস্বীকার করেছে। সেই সঙ্গে জানিয়েছে যে সংকট সমাধানের জন্য রাশিয়ার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছে তা কার্যকরী পন্থা নয়। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই মঙ্গলবার তার স্প্যানিশ প্রতিনিধির সাথে একটি ফোন কলের সময় বলেছিলেন, ”ইউক্রেন সংকটের একটি পক্ষ হবার ইচ্ছে চীনের নেই এবং তারা চায় না যে নিষেধাজ্ঞাগুলি চীনকে প্রভাবিত করুক।” এই সপ্তাহের শুরুতে ইউক্রেনে চীনের রাষ্ট্রদূতের করা মন্তব্যের প্রতি বুধবার বেইজিং তার পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। সেই সঙ্গে চীন স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা কখনই ইউক্রেনে আক্রমণ করবে না। বরং তারা অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করবে।
রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের কারণে চীনা কোম্পানিগুলি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে পারে, সাম্প্রতিক দিনগুলিতে এমন আশঙ্কার প্রভাব পড়েছিল চীনা স্টকমার্কেটে। সেই মন্দা পরিস্থিতি বুধবার বদলে যায়, কারণ বেইজিং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং আর্থিক বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে তারা নির্দিষ্ট নীতি অনুসরণ করবে। মার্কিন কর্মকর্তারা সোমবার সিএনএনকে বলেছেন যে তাদের কাছে এমন তথ্য রয়েছে যা থেকে জানা যাচ্ছে, চীন রাশিয়াকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে চলেছে। যদিও চীন এটিকে বিভ্রান্তিকর খবর বলে উড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন যে চীন রাশিয়াকে সমর্থন করার মধ্যে “একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য” স্থাপনের চেষ্টা করছে। বেইজিং এবং মস্কো পশ্চিমকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য একটি কৌশলগত স্বার্থ শেয়ার করে। চীনা ব্যাঙ্কগুলি মার্কিন ডলারে অ্যাক্সেস হারাতে পারে না এবং অনেক চীনা শিল্প মার্কিন প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত হতে পারে না। চীন রাশিয়ার এক নম্বর বাণিজ্য অংশীদার হলেও বেইজিং অন্যান্য বিষয়ও মাথায় রাখছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চীনের মোট বাণিজ্যের পরিমাণের মাত্র ২%। গত বছরের চীনা শুল্ক পরিসংখ্যান অনুসারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় শেয়ার রয়েছে এতে। বিচ্ছিন্ন এবং ভেঙে পড়া রাশিয়ান অর্থনীতি থেকে নিজেকে দূরে রাখতে গত কয়েক সপ্তাহে বেইজিং কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।

রুবেলকে বাদ দেওয়া
চীনের মুদ্রা, ইউয়ান, সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বাণিজ্য করে না। পরিবর্তে পিপলস ব্যাংক অফ চায়না (PBOC) এর কর্মকর্তাদের দ্বারা নির্ধারিত ব্যান্ডের মধ্যে চলে। গত সপ্তাহে, তারা রুবেল ট্রেডিং রেঞ্জের আকার দ্বিগুণ করেছে, যার ফলে রাশিয়ান মুদ্রার দ্রুত পতন ঘটতে পারে। ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে রুবেল ইতিমধ্যেই ডলার এবং ইউরো উভয়ের বিপরীতে তার মূল্যের ২০% এরও বেশি হারিয়েছে। ইউয়ানের বিপরীতে রাশিয়ান মুদ্রার পতন অব্যাহত থাকলেও বেইজিং মস্কোর কোনো উপকার করছে না। পরিবর্তে স্মার্টফোন এবং গাড়ির মতো চীনা দ্রব্য আমদানির জন্য রাশিয়ানদের এখন বেশি রুবেল দিতে হবে। যুদ্ধের আগে Xiaomi এবং Huawei এর মতো চীনা ফোন ব্র্যান্ডগুলি রাশিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। তারা রীতিমত Apple এবং Samsung এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিল। গ্রেট ওয়াল মোটর এবং গিলি অটোর মতো চীনা গাড়ি নির্মাতারা, রাশিয়ার বাজারের৭ % দখল করে আছে, গত বছর ১ লক্ষ ১৫ হাজারের বেশি গাড়ি তারা বিক্রি করেছে৷ ট্রেডিং ব্যান্ড প্রসারিত হলে ইউয়ান রুবেলের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে, এর ওপর নির্ভর করে চীনা কোম্পানিগুলির ভবিষ্যত। চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে বর্তমানে, চীন-রাশিয়ার প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ইউয়ানে পরিচালিত হয়।

রিজার্ভের ওপর প্রভাব
মঙ্গলবার একটি গবেষণা প্রতিবেদনে নাটিক্সিসের এশিয়া প্যাসিফিকের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো লিখেছেন, ৯০বিলিয়ন ডলার মূল্যের ইউয়ান রিজার্ভের মাধ্যমে চীন রাশিয়াকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলি রাশিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে লেনদেন নিষিদ্ধ করেছে৷ যার জেরে রাশিয়ার রিজার্ভের প্রায় ৩১৫ বিলিয়ন ডলার হিমায়িত হয়ে রয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মিডিয়া অনুসারে, রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী আন্তন সিলুয়ানভ এই সপ্তাহে বলেছিলেন যে মস্কোকে মার্কিন ডলার এবং ইউরো অ্যাক্সেস করতে বাধা দেওয়ার পরে দেশটি ইউয়ান রিজার্ভ ব্যবহার করতে চায়। পিপলস ব্যাংক অফ চায়না বা পিবিওসি এখনও পর্যন্ত এই মজুদ সম্পর্কে তার অবস্থান নিয়ে কোনও মন্তব্য করেনি। গার্সিয়া-হেরেরো উল্লেখ করেছেন, চীন যদি মস্কোকে তার ইউয়ান রিজার্ভকে মার্কিন ডলার বা ইউরোতে রূপান্তর করার অনুমতি দেয়, এটি স্পষ্টভাবে রাশিয়ার বর্তমান অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। সেই সঙ্গে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঝুঁকি PBOC-এর জন্যও একটি বিশাল পদক্ষেপ হবে।

বিমানের যন্ত্রাংশ আটকে রাখা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বারা আরোপিত নিষেধাজ্ঞার অর্থ হল বিশ্বের দুটি প্রধান বিমান নির্মাতা সংস্থা বোয়িং (বিএ) এবং এয়ারবাস (ইএডিএসএফ), রাশিয়ান এয়ারলাইনগুলির জন্য খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ বা রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা প্রদান করতে আর সক্ষম নয়৷ জেট ইঞ্জিন নির্মাতাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এর অর্থ হল রাশিয়ান এয়ারলাইন্সগুলির কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ফুরিয়ে যেতে পারে, বা নিরাপদে বিমান পরিচালনার জন্য প্রস্তাবিত ঘন ঘন সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন না করেই বিমানগুলি উড়তে পারে। এই মাসের শুরুতে, একজন শীর্ষ রুশ কর্মকর্তা বলেছিলেন যে চীন রাশিয়ায় বিমানের যন্ত্রাংশ পাঠাতে অস্বীকার করেছে কারণ মস্কো বিকল্প সরবরাহের সন্ধান করছে। রাশিয়ার এয়ার ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির প্রধান ভ্যালেরি কুডিনভ রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসকে বলেছেন যে, রাশিয়া চীন থেকে বিমানের যন্ত্রাংশ না পেলে তুরস্ক এবং ভারত সহ অন্যান্য দেশগুলি থেকে যন্ত্রাংশ পাবার চেষ্টা করবে। যদিও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিএনএন -কে জানিয়েছে যে চীন এবং রাশিয়া নিজেদের মধ্যে “স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা” বজায় রাখবে। চীন এবং রাশিয়া বোয়িং এবং এয়ারবাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে একটি নতুন দীর্ঘ পাল্লার, ওয়াইডবডি যাত্রীবাহী বিমান তৈরি করতে ২০১৭ সালে একটি বেসামরিক বিমান চলাচলের যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যেই CR929-এর উৎপাদন শুরু হয়েছে, কিন্তু সরবরাহকারীদের নিয়ে মতবিরোধের কারণে বিষয়টি বিলম্ব হয়েছে। বিমানটি প্রাথমিকভাবে ২০২৪ সালে গ্রাহকদের জন্য পরিষেবা দেবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়া ২০২৮ থেকে ২০২৯ পর্যন্ত সময়সীমা পিছিয়ে দিয়েছে।

অবকাঠামো বিনিয়োগ বন্ধ
ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর রাশিয়া ও বেলারুশে তাদের সব কর্মসূচি স্থগিত করেছে বিশ্বব্যাংক। এটি ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়াকে কোনো নতুন ঋণ বা বিনিয়োগ অনুমোদন করেনি এবং ২০২০ সাল থেকে বেলারুশে কোনো বিনিয়োগ অনুমোদন করেনি। আরও আশ্চর্যের বিষয়, সম্ভবত, বেইজিং-ভিত্তিক এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের সিদ্ধান্তটিও একই রকম। ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে একটি বিবৃতিতে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক জানিয়েছিল, ব্যাংকের সর্বোত্তম স্বার্থে রাশিয়া এবং বেলারুশ সম্পর্কিত তাদের সমস্ত কার্যক্রম স্থগিত করা হচ্ছে । বিশ্বব্যাংক (ওয়াশিংটন, ডি.সি. ভিত্তিক) এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কের (যেখানে জাপান একটি প্রধান শক্তি), আপেক্ষিক প্রভাবের কারণে হতাশ হয়ে চীন ২০১৬ সালে AIIB বা এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক চালু করে। সদর দফতর পরিচালনার পাশাপাশি চীন এই ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট পদে রয়েছে এবং এর ভোট ২৬.৫ % । ভারত ও রাশিয়ার রয়েছে যথাক্রমে ৭.৬ % এবং ৬%।রাশিয়ায় কার্যক্রম স্থগিত করার AIIB-এর সিদ্ধান্তের অর্থ হল দেশের সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের উন্নতির লক্ষ্যে অনুমোদিত বা প্রস্তাবিত ঋণের ১.১ বিলিয়ন এখন আটকে আছে।

সূত্র : edition.cnn.com
কলমে : সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

Share Now
January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031