আজ এক মাস পূর্ণ হচ্ছে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার । পশ্চিমা দেশগুলো গত ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই হামলাকে পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার আগ্রাসন হিসেবে আখ্যায়িত করলেও, ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বাধীন রুশ সরকার অবশ্য তা মানে না।

তাদের দাবি, ইউক্রেনকে নিজেদের অক্ষে নিয়ে রাশিয়ার স্বার্থের বিরুদ্ধে কলকাঠি নাড়ার পশ্চিমা অভিসন্ধি নস্যাৎ করতেই তারা এ হামলা চালিয়েছে। যার মূল লক্ষ্য রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষা। তবে এর মধ্যেই এই যুদ্ধ নিয়ে গোটা বিশ্বে মেরুকরণ ঘটে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যাচ্ছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। তাদের মিত্র দেশগুলোও জাতিসংঘে রাশিয়ার এ হামলার বিরোধিতা করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

অন্যদিকে চীন, ভারতের মতো দুই পরাশক্তি বজায় রেখেছে মধ্যম পন্থা। বাংলাদেশের মতো কিছু ছোট দেশও কোনো পক্ষ নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে ইউক্রেনকে ন্যাটোয় অন্তর্ভুক্ত করার লোভ দেখিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় সামরিক পরাশক্তি রাশিয়ার বিরুদ্ধে উসকে দেওয়ার। কিন্তু রাশিয়া যখন এ অবস্থার সুযোগ নিল, তখন ইউক্রেনের পাশে আদতে কেউ নেই। কারণ যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো ভালো করেই জানে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের জবাবে তারা কিছু করতে গেলেই শুরু হতে পারে আরও ভয়ানক এক যুদ্ধ। যা পারমাণবিক যুদ্ধে মোড় নেওয়ারও আশঙ্কা আছে। ফলে আপাতত নিষেধাজ্ঞা ও বাগাড়ম্বর করেই দিন অতিবাহিত করছে তারা। যে ন্যাটোয় যোগ দেওয়া নিয়ে এত ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে হলো ইউক্রেনকে সে প্রক্রিয়াও থমকে গেছে।

ইউক্রেনের আকাশকে নো ফ্লাই জোন ঘোষণা করার অনুরোধও রাখেনি পশ্চিমারা। ফলে এখন ন্যাটোতে যাওয়ার আশা ত্যাগ করে রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজছে ইউক্রেন। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের এই পর্যায়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিশ্বজুড়ে যে মেরুকরণ হয়েছে তা ভবিষ্যতে চিহ্নিত করে দেবে কোন দেশ কাদের শত্রæ মিত্র। সে অনুযায়ীই আবর্তিত হবে ভবিষ্যৎ বিশ্ব রাজনীতি।

আজ যুদ্ধের এক মাস পূর্তিতে ইউক্রেনে যখন রুশ হামলা ও পাল্টা প্রতিরোধ অব্যাহত আছে, তখন ব্রাসেলসে জরুরি বৈঠকে বসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ ন্যাটো নেতারা। বিবিসি যাকে উল্লেখ করেছে ন্যাটোর ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হিসেবে। শুধু ন্যাটো জোট নয়, বৈঠকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-সেভেনের নেতারাও যোগ দিচ্ছেন। বৈঠকের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেছেন, তিনি আশা করছেন এ বৈঠক থেকে ইউক্রেনকে সাহায্য করার প্রশ্নে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একত্রিত করতে পারবেন।

বিবিসির খবরে বলা হয়, ইউক্রেনে সেনা হামলার পেছনে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রধান তাড়না ছিল, একটি বার্তা দেওয়া যে পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার দোরগোড়ায় ন্যাটো জোটের সম্প্রসারণ, সামরিক তৎপরতা তিনি বরদাশত করবেন না। তবে ন্যাটো যে পুতিনের সেই দাবিকে বিন্দুমাত্র গ্রাহ্য করছে না সেই বার্তা বৃহস্পতিবারের বৈঠক থেকে পরিষ্কার করা হবে বলে বলা হয়েছে। ন্যাটো মহাসচিব ইয়েন স্টোলটেনবার্গ বলেছেন, বৈঠক থেকে বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া এবং ¯েøাভাকিয়ায় ন্যাটো সেনা উপস্থিতি বাড়াবে। সেই সঙ্গে, রাশিয়ার সম্ভাব্য রাসায়নিক-জীবাণু ও পারমাণবিক অস্ত্রের হামলায় ইউক্রেনকে সাহায্যের উপায় নিয়ে কথা হবে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিখাইল বলেছেন, পুতিনকে অবশ্যই হারতে হবে। এর জন্য আমরা ইউক্রেনকে সব ধরনের সহায়তা করব।

ইউক্রেন ন্যাটোয় যুক্ত হওয়ার আশা বাদ দিলেও তাদের সাহায্য নিতে এখনো মুখিয়ে আছে। ইতোমধ্যে বৈঠকে সাহায্য চেয়ে গতকাল ভার্চুয়ালি বক্তব্য দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি বলেছেন, ইউক্রেনে চলমান রুশ অভিযান যদি আমরা ঠেকাতে না পারি, তার অর্থ হলো রাশিয়ার সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রই এখন ঝুঁকিতে আছে। রাশিয়া ইউক্রেনে হামলায় ফসফরাস বোমা ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এর আগে বুধবার এক ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি বলেছেন, ন্যাটো, জি-৭ এবং ইইউর বৈঠকে আমাদের দৃঢ় অবস্থান থাকবে। এই তিন বৈঠকে আমরা দেখব, কারা আমাদের বন্ধু, কারা আমাদের অংশীদার এবং কারা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।

গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকের আগে অবশ্য ইউক্রেনের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। গতকাল রাশিয়ার আইনসভার ৩০০ সদস্যের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ইউক্রেন থেকে পালানো এক লাখ মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় দেওয়া হবে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য ঘোষণা করেছে, ইউক্রেনকে আরও ৬ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র দেবে।

এদিকে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে গতকালও হামলা ও পাল্টা প্রতিরোধ অব্যাহত ছিল। রুশ বাহিনী দাবি করেছে, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইজিয়ামের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারা। ইউক্রেন দাবি করেছে, রুশ বাহিনীর দখলে থাকা রাজধানী কিয়েভের আশপাশের কিছু অঞ্চলে তারা পূনঃনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ইউক্রেনের নৌবাহিনী দাবি করেছে, আজভ সাগরের পারে বারদিনস্ক বন্দরে থাকা একটি রুশ জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ধ্বংস করে দিয়েছে তারা

Share Now
January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031