বৈজ্ঞানিক শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয় নোবেল পুরস্কারকে। সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের উইলের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এই পুরস্কার আধুনিক সময়ের যুগান্তকারী সব আবিষ্কার ও আবিষ্কারকদের সম্মানিত করেছে। যদিও অনেক প্রতিভাবান বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকের কাজকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলেও সমালোচনা রয়েছে।

নোবেল পাননি—এ তালিকায় স্টিফেন হকিংয়ের নাম বলা যায়। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং। তাঁর প্রধান কাজ ব্ল্যাকহোল–সম্পর্কিত তত্ত্ব। সাধারণ আপেক্ষিকতা ও কোয়ান্টাম মেকানিকসের মধ্যে তাঁর কাজ কার্যকরভাবে সংযোগ স্থাপন করেছিল। তিনি ‘হকিং রেডিয়েশন’ তত্ত্বের প্রস্তাব করেন, যেখানে ব্ল্যাকহোল থেকে কণা নির্গত হতে পারে। তাঁর বিভিন্ন তত্ত্ব নোবেল পুরস্কারের যোগ্য বলা হয়। যদিও পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার সাধারণত এমন আবিষ্কারের জন্য দেওয়া হয় যা পরীক্ষামূলকভাবে সরাসরি প্রমাণিত হয়। হকিং রেডিয়েশনের পরীক্ষামূলক প্রমাণ তাঁর জীবদ্দশায় সম্ভব হয়নি।
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদার্থবিজ্ঞানী হলেন লিস মাইটনার। এই নারী বিজ্ঞানী ও অটো হান একত্রে পারমাণবিক ফিউশনের ঘটনাটি আবিষ্কার করেন। বিজ্ঞানী মাইটনার কেবল এই প্রক্রিয়ার ধারণাই দেননি, তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি নিউক্লিয়ার ফিউশন শব্দটি ব্যবহার করে এর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন। অস্ট্রিয়ান-ইহুদি হওয়ার কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি জার্মানি থেকে সুইডেনে পালিয়ে যান। সে সময় মাইটনারের অবদানকে পাশে রেখে একাই ফিউশন নিয়ে গবেষণার তথ্য প্রকাশ করেন অটো হান। যে কারণে ১৯৪৪ সালে হান যখন রসায়নে নোবেল পুরস্কার জেতেন, তখন মাইটনারকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়। মাইটনারের সহকর্মীরা মনে করেন, তাঁর নোবেল বঞ্চনা ছিল বড় একটা

আরেক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু হলেন আধুনিক কণাপদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি স্থাপনকারী। ১৯২০ দশকের শুরুতে তিনি কোয়ান্টাম মেকানিকসের ওপর যুগান্তকারী কাজ করেন, যা বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান ও বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট বা পদার্থের পঞ্চম অবস্থার তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করে। তাঁর কাজ নোবেল কমিটির বিশেষজ্ঞ অসকার ক্লাইন মূল্যায়ন করেছিলেন। যদিও তিনি মনে করেননি যে তাঁর কাজটি নোবেল পুরস্কারের যোগ্য। অবাক করার বিষয় হচ্ছে, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কাজ অনুসরণ করে অনেক বিজ্ঞানী একাধিক নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। মহাবিশ্বের অর্ধেক কণা ‘বোসন কণা’ হিসেবে তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে।

বিখ্যাত ব্রিটিশ বায়োফিজিসিস্ট ও ডিএনএ গবেষণার ক্ষেত্রে অগ্রদূত ছিলেন রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন। তিনি ১৯৫২ সালে এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন ব্যবহার করে ডিএনএর ডাবল হেলিক্স কাঠামোর সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র ‘ফোটো–৫১’ তৈরি করেন। তাঁর এই চিত্রই জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিককে ডিএনএর সঠিক আণবিক কাঠামো আবিষ্কারে চূড়ান্ত সূত্র প্রদান করেছিল। ডিএনএ আবিষ্কারের জন্য ১৯৬২ সালে ওয়াটসন, ক্রিক ও মরিস উইলকিন্স চিকিৎসাবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। সেই স্বীকৃতির অংশীদার হতে পারেননি ফ্র্যাঙ্কলিন। ১৯৫৮ সালে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে ক্যানসারে তাঁর অকালমৃত্যু হয়। নোবেল পুরস্কার মরণোত্তর দেওয়া হয় না বলে বাদ পড়েন তিনি।

রসায়নশাস্ত্রের ভিত্তি পর্যায় সারণির আধুনিক রূপকার ছিলেন রুশ রসায়নবিদ দিমিত্রি মেন্ডেলিভ। ১৮৬৯ সালে তিনি মৌলগুলোকে তাদের পারমাণবিক ওজন অনুসারে সাজিয়ে পর্যায় সারণি তৈরি করেন। তিনি সারণিতে কিছু খালি স্থান রেখে যান এবং সেই অনাবিষ্কৃত মৌলের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করেন। মেন্ডেলিভের কাজের সময় নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়নি। তিনি যখন জীবিত ছিলেন, তখন ১৯০৫ সাল থেকে টানা তিন বছর নোবেলের জন্য তাঁর নাম শোনা গেলেও নির্বাচিত হননি।

নোবেল পাননি আরেক বিজ্ঞানী জোসেলিন বেল বার্নেল। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী। ১৯৬৭ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ছাত্রী হিসেবে তিনি পালসার আবিষ্কার করেন। এটি দ্রুত ছোটা নিউট্রন তারার বেতার তরঙ্গ। তাঁর এই আবিষ্কার আধুনিক জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে বিপ্লব এনেছিল। পালসারের আবিষ্কারের জন্য ১৯৭৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল তাঁর পিএইচডি সুপারভাইজার অ্যান্টনি হিউইশ ও মার্টিন রাইলকে। যদিও বিজ্ঞানী হিউইশকে আবিষ্কার তত্ত্বাবধানের জন্য কৃতিত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বার্নেল প্রথম তথ্য বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক সিগন্যাল শনাক্ত করলেও তিনি পুরস্কার থেকে বাদ পড়েন।

এই তালিকায় বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলাকেও রাখেন অনেকেই। তাঁর অনেক যুগান্তকারী আবিষ্কার নোবেল কর্তৃপক্ষের মনোযোগ টানতে পারেনি। এ ছাড়া আরেক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনকেও এই তালিকায় রাখা হয়। তিনি ১৯২১ সালে ফটোইলেকট্রিক ইফেক্টের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। অথচ তাঁর প্রভাবশালী সমীকরণ ‘ই ইকুয়েলস টু এমসি স্কয়ার’ বা আপেক্ষিকতার জন্য তিনি নোবেল জয় করেননি।

সূত্র: ক্যান্টরসপ্যারাডাইস ডটকম

Share Now
January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031