মাত্র ৩০ মাইল প্রশস্ত এক সরু পানিপথ হলো হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝে অবস্থিত । আয়তনে ছোট হলেও এর গুরুত্ব বিশ্ব এখন টের পাচ্ছে। কারণ, বিশ্বের সমুদ্রপথে মোট তেল–বাণিজ্যের প্রায় এক–চতুর্থাংশই এই পথ দিয়ে পারাপার হয়। একে বলা হয় বিশ্বের প্রধান সামুদ্রিক ‘চোকপয়েন্ট’ বা যানজটের কেন্দ্রবিন্দু। যদি কোনো কারণে এই সরু পথে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তবে মুহূর্তেই বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে বর্তমানে ঠিক এমনই এক সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী অধ্যাপক মাইক সার্লের জানান, এই প্রণালিটি কেবল অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং একটি ভূতাত্ত্বিক বিস্ময়ও বটে। কারণ, এটি পৃথিবীর সেই বিরল স্থানগুলোর একটি, যেখানে সরাসরি দুটি বিশাল মহাদেশের সংঘর্ষের চিহ্ন দেখা যায়। মাটির গভীরে চলা এই বিশাল ভূতাত্ত্বিক কারণেই আজকের এই অদ্ভুত ও গুরুত্বপূর্ণ পানিপথটি তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ ইরানের জাগ্রোস পর্বতমালা থেকে শুরু করে হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু বিন্দু পর্যন্ত তাকালে এক অদ্ভুত ভূপ্রকৃতি চোখে পড়ে। এখানে ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপটি যেন একটি ধারালো ছুরির মতো ইরানের দিকে উত্তর দিকে প্রসারিত হয়ে আছে। এই উপদ্বীপের খাড়া কালো পাথরের পাহাড় আর আঁকাবাঁকা উপকূলরেখা পৃথিবীর অন্যতম বিরল এক দৃশ্য।
আরও পড়ুন
ব্যালিস্টিক মিসাইল আকাশে ধ্বংস করা হয় কীভাবে
২৩ এপ্রিল ২০২৪
ব্যালিস্টিক মিসাইল আকাশে ধ্বংস করা হয় কীভাবে
মুসান্দাম উপদ্বীপটি একটি বিস্ময়। কারণ, এখানে মাটির ওপরেই দেখা মেলে ‘ওফিওলাইট’ নামক এক বিশেষ ধরনের শিলা। সাধারণত এই পাথরগুলো সমুদ্রের তলদেশের অনেক গভীরে চাপা পড়ে থাকে। কিন্তু এখানে সেগুলো প্রাকৃতিকভাবেই মাটির ওপরে উন্মুক্ত হয়ে আছে। এটি নিঃসন্দেহে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং সেরা ওফিওলাইট কমপ্লেক্স। তবে মজার বিষয় হলো, যে ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার কারণে এই প্রণালিটি এত অনন্য ও সুন্দর হয়ে উঠেছে, সেই একই কারণে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে।
এখানে মাটির ওপরেই দেখা মেলে ‘ওফিওলাইট’ নামক এক বিশেষ ধরনের শিলা
এখানে মাটির ওপরেই দেখা মেলে ‘ওফিওলাইট’ নামক এক বিশেষ ধরনের শিলা
হরমুজ প্রণালি কীভাবে তৈরি হয়েছিল
পৃথিবীর মানচিত্রে আমরা যে সরু জলপথ বা প্রণালিগুলো দেখি, সেগুলো মূলত লাখ লাখ বছর ধরে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালির গল্পটিও শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি বছর আগে।
সেসময় দক্ষিণে ছিল আরবীয় প্লেট আর উত্তরে ইউরেশীয় প্লেট। এই দুই বিশাল ভূখণ্ডের মাঝখানে ছিল প্রাচীন টেথিস মহাসাগর। ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক অ্যালেনের জানান, আরবীয় প্লেটটি ধীরে ধীরে ইউরেশীয় প্লেটের নিচে ঢুকে যেতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সাবডাকশন’ বা অধোগমন। এই ধাক্কায় একসময় টেথিস মহাসাগর হারিয়ে যায় এবং দুই ভূখণ্ড মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
আরও পড়ুন
ইরান কি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেবে
২৩ জুন ২০২৫
ইরান কি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেবে
দুটি গাড়ি মুখোমুখি ধাক্কা খেলে যেমন সামনের অংশ দুমড়েমুচড়ে যায়, এই দুই প্লেটের সংঘর্ষেও ঠিক তেমনটাই ঘটেছিল। এর ফলে তৈরি হয় ইরানের আজকের বিশাল জাগ্রোস পর্বতমালা। আরবীয় প্লেটটি যখন এই পর্বতমালার চাপে নিচের দিকে বেঁকে যায়, তখন সেখানে একটি বিশাল গর্ত বা অববাহিকার সৃষ্টি হয়। এই নিচু অংশটিই আজকের পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির ভিত্তি।
আজ থেকে প্রায় ২০ হাজার বছর আগেও পারস্য উপসাগর এতটাই অগভীর ছিল যে অনেক জায়গায় হেঁটে পার হওয়া যেত। কিন্তু শেষ তুষারযুগের পর যখন বিশাল বরফের চাদর গলতে শুরু করে, তখন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বাড়তে থাকে। মাত্র ১৫ হাজার বছরে সমুদ্রের পানি প্রায় ১০০ মিটার ওপরে উঠে আসে। এই উপচে পড়া পানিই একসময় পারস্য উপসাগরকে প্লাবিত করে এবং টাইগ্রিস ইউফ্রেটিস নদীর পানি নিয়ে হরমুজ প্রণালিকে আজকের পূর্ণ রূপ দেয়।
আরও পড়ুন
এআই যেভাবে বদলে দিচ্ছে ইরান যুদ্ধ
১৫ মার্চ ২০২৬
এআই যেভাবে বদলে দিচ্ছে ইরান যুদ্ধ
হরমুজ প্রণালি যেভাবে সম্পদের ভান্ডার ও প্রাকৃতিক বিস্ময়
ওমান আর ইরানের মাঝখানের সরু হরমুজ প্রণালি কেবল রাজনীতির কারণে নয়, বরং এর অদ্ভুত ভূগঠনের জন্য বিজ্ঞানীদের কাছে এক বড় বিস্ময়। কোটি কোটি বছর আগে আরবীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের মধ্যে যে বিশাল সংঘর্ষ হয়েছিল, তার চিহ্ন আজও এই অঞ্চলের পাহাড়ে ও মাটিতে স্পষ্ট। উত্তরে ইরানের জাগ্রোস পর্বতমালায় বিশাল চুনাপাথরের স্তরের পাশাপাশি দেখা যায় বিরল লবণ হিমবাহ, যেখানে মাটির গভীর থেকে লবণ উঠে এসে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে আসে।
হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালিফাইল ছবি: রয়টার্স
এই মহাদেশীয় সংঘর্ষই মধ্যপ্রাচ্যকে উপহার দিয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম তেলের ভান্ডার। কয়েক কোটি বছর আগে এই পুরো এলাকাটি সমুদ্রের নিচে থাকায় সেখানে প্রচুর জৈব পদার্থ জমা হয়েছিল। প্লেটগুলোর ধাক্কায় তৈরি হওয়া বিশেষ শিলাস্তরের নিচে সেই তেল ও গ্যাস আটকে পড়ে বিশাল ভান্ডার তৈরি করেছে। এই প্রাকৃতিক ট্র্যাপগুলো এতই বড় যে দশকের পর দশক ধরে এখান থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।
দক্ষিণে ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপটি তৈরি হয়েছে সমুদ্রের গভীর তলদেশ থেকে উঠে আসা বিরল শিলা ওফিওলাইট দিয়ে। এই উপদ্বীপটি বর্তমানে ধীরগতিতে উত্তর দিকে ইরানের পাহাড়গুলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে হরমুজ প্রণালি প্রতিনিয়ত আরও সরু হয়ে পড়ছে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, এই পথটি একসময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে ভয়ের কিছু নেই, প্রকৃতির এই বিশাল পরিবর্তনে আরও অন্তত এক কোটি বছর সময় লাগবে।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
