কক্সবাজারস্থ রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠেছে । রিপোর্ট বলছে, ক্যাম্পে থাকা সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের সঙ্গে সংযোগ ঘটছে বাইরের অপরাধীদের। ফলে ক্যাম্পে ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র। কোটি টাকার মাদক বাণিজ্য এবং মানব ও নারী পাচারের মতো ভয়ঙ্কর সব কারবারের নিয়ন্ত্রণ তথা ক্যাম্পে অধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অহরহ সহিংসতা ঘটছে। রিপোর্টে প্রকাশ গত দু’বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গোলাগুলি, গলা কেটে হত্যাসহ অন্তত অর্ধশতাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। হতাহতের এসব ঘটনায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশিও রয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আচমকা অস্থিরতা বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন সরকারের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে নীতি নির্ধারকদের কাঠোর পদক্ষেপ সংক্রান্ত নির্দেশনা চাইছেন তারা।

আর বিশ্লেষকদের আশঙ্কা জনবহুল রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকা সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ তথা তাদের নিরস্ত্রকরণে সরকারের ক্রাশ প্রোগ্রাম জরুরি। তা না হলে ক্যাম্প তথা স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকা যেকোনো সময় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। মাঠ প্রশাসনের রিপোর্ট এবং বিশ্লেষকদের আশঙ্কার বিষয়ে ঢাকার এক কর্মকর্তা গতকাল বলেন, স্থানীয় রিপোর্টের ভিত্তিতে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় প্রাণহানি রোধসহ ক্যাম্পে সহিংসতা ঠেকাতে কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে সদ্য অনুষ্ঠিত মিয়ানমার নাগরিকদের সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কিত জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সভায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নেতৃত্বাধীন ওই কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সামগ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদারে জরুরি পদক্ষেপের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যা এখন বাস্তবায়ন হচ্ছে। স্বল্প এবং মধ্য মেয়াদি দু’ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, বৈঠকে সাম্প্রতিক সহিংসতা, ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তথা নিরাপদ পরিবেশের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ওই আলোচনার প্রেক্ষিতে যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন, রোহিঙ্গাদের যত্রতত্র অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের চলমান কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিতদের আরো কঠোর হওয়া। সভায় জানানো হয়- প্রস্তাবিত মোট ১৪২ কিলোমিটার বেড়ার মধ্যে ১১১ কিলোমিটারের কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাকিটা আগামী ৬ মাসের মধ্যে শেষ করার কথা রয়েছে। মধ্য মেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ক্যাম্প এলাকার প্রতিটা ইঞ্চি মাটি নজরদারির আওতায় আনা, চারপাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণ এবং সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সময় সাপেক্ষ উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, এগুলো রাতারাতি করা সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্টের পর থেকে সাত লাখ ৪১ হাজার ৮৪১ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ রোহিঙ্গার বাস কক্সবাজারের ৩৫টি ক্যাম্পে।

পররাষ্ট্র দপ্তরের সভায়ও রোহিঙ্গাদের বিষয়ে উদ্বেগ: সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গা বিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের সভায়ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিবেশ তথা অনিবন্ধিত মিয়ানমার নাগরিকদের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ভয়ঙ্কর অপরাধ সংঘটনসহ নানা নেতিবাচক কমকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে ওই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বলা হয়- ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্টের পরে ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। এর আগে ২০১৬ সালে আসে প্রায় ৮৭ হাজার। তারও আগে থেকে বাংলাদেশে অবৈধভাবে বসবাস করছে প্রায় ৩-৪ লাখ বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক। সবমিলে বাংলাদেশে মানবিক কারণে আশ্রয় গ্রহণকারী প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো নিবন্ধনের বাইরে রয়ে গেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি রোধে অনিবন্ধিত এসব রোহিঙ্গাদের জরুরি নিবন্ধনের আওতায় আনার বিষয়ে টাস্কফোর্সের সভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়।

Share Now
October 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031