সেগুনবাগিচায় বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে কূটনৈতিক অ্যাসাইনমেন্টে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একটি সভা নিয়ে রীতিমতো অস্থিরতা চলছে । এ নিয়ে পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা অবশ্য এ নিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেয়ে নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ, চিঠি চালাচালি এবং পাল্টা প্রস্তাব ও মতামত দেয়াতেই জোর দিচ্ছেন। সে মতেই প্রস্তুতি চলছে। কোনো রকম ব্লেমগেম নয়, বিদেশে অন্যান্য দেশের মিশন বিশেষ করে প্রতিবেশী এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মিশন কীভাবে পরিচালিত হয় তা বিবেচনায় নিলেই সব জটিলতার অবসান ঘটবে বলে মনে করে সেগুনবাগিচা। কর্মকর্তারা বলেন- এটা খুবই দুঃখজনক যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আলোচনায় ‘শেয়ারড্‌ লিডারশিপ’ বা অংশীদারী নেতৃত্বের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সভায় বলা হয়- দূতাবাসগুলোর উইং সমূহ স্বাধীনভাবে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে। দূতাবাস প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবেন। সভায় এ-ও বলা হয়- দূতাবাসগুলো বিদেশে বাংলাদেশের এক একটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মতো। অনুষ্ঠানের সভাপতি মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম অবশ্য তার সমাপনী বক্তব্যে শেয়ারড্‌ লিডাইশপের ধারণা নাকচ করে দিয়েছেন। বলেন- মিশনে যারাই কাজ করেন তারা যে ক্যাডারের হোন না কেন তারা দেশের হয়ে কাজ করেন। সুন্দর পরিবেশের (হারমনিয়াস) স্বার্থে তারা একসঙ্গে মিলে মিশন প্রধানের নেতৃত্বেই কাজ করবেন। বিস্তৃত ওই আলোচনায় দূতাবাসগুলোতে অব্যবস্থাপনা, এসিআর জটিলতা, উইংগুলোর স্বতন্ত্র একাউন্ট না থাকা এবং প্রটোকল দায়িত্ব পালন বিষয়ে মনোমালিন্যের অভিযোগ ওঠে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে ওই আলোচনা এবং মতামতগুলোর সঙ্গে বৃহত্তর পরিসরে দ্বিমত পোষণ করা হয়। আলোচনায় অংশ নিয়ে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বলেন- এসিআর জটিলতা নিরসনে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। দূতাবাসগুলোর অব্যবস্থাপনা বিষয়ে যে বক্তব্যগুলো এসেছে তা ঢালাওভাবে সব দূতাবাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এগুলো কেস টু কেস বিবেচনা করতে হবে। আলোচনায় অনেকেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিচ্ছিন্ন ঘটনার আলোকে তার নিজের মিশনের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। যা অধিকাংশ মিশনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। পররাষ্ট্র সচিব বলেন- কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সার্বিক চিত্র বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনসমূহ আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি এবং অন্যান্য দেশের মিশনসমূহের পরিচালনা পদ্ধতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রাষ্ট্রদূতগণ পরিচালনা করে থাকেন। ফলে মিশনগুলোর কর্ম পরিবেশ দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্থা (যেমন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়) থেকে ভিন্নতর হবে। পররাষ্ট্র সচিব তার বক্তব্যে মিশনের একটি একাউন্ট থাকার পক্ষে মত দেন। একই সঙ্গে উইংগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্তদের মিশনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বিশেষত প্রটোকল দায়িত্ব পালনে আরো স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের অনুরোধ জানান। মিশনসমূহে পদায়নের পর সকলেই কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন বিধায় তাদের ক্যাডার পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অনুরোধও জানান পররাষ্ট্র সচিব। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওই মতবিনিময় সভার আলোচনা, পর্যালোচনা এবং সিদ্ধান্তের বিষয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের তরফে যে ব্যাখ্যা, মূল্যায়ন ও পাল্টা প্রস্তাব সরকারের নীতিনির্ধারিণী পর্যায়ে উত্থাপনের জন্য তৈরি করা হয়েছে তাতে মোটা দাগে কয়েকটি বিষয় ওঠে এসেছে। তা হলো- পেশাদার কূটনীতিকরা মনে করেন- আমলাতন্ত্রে শেয়ারড্‌ লিডারলিপের কোনো স্থান নেই। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী দূতাবাস প্রধানের নেতৃত্বে এবং উইংগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমেই সবাই পেশাগত দায়িত্ব পালন করবেন। এতে সংস্কার প্রয়োজন হলে অন্যান্য দেশের মিশনের প্রচলিত ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করে এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। রুলস অব বিজনেস মতে, বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক, কনস্যুলার বা বাণিজ্যিক মিশন প্রতিষ্ঠা এবং তাদের প্রাপ্ত সুবিধাদি (ইম্মিউনিটিস) নিশ্চিত করার জন্য দরকষাকষির দায়িত্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। সে বিষয়টি স্মরণ করে পেশাদার কূটনীতিকরা বলছেন- বিদেশে বাংলাদেশের জনবল বৃদ্ধি কিংবা কামানোর বিষয়টি ওই দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাবিত করে।

প্রয়োজন বিবেচনায় প্রথা অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ ও সমন্বয়ক্রমে সরকার এ বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে রুলস অব বিসজেস বলছে- বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক প্রভাবিত করে এমন কোনো বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পূর্ব পরামর্শ ব্যতিরেকে কোনো মন্ত্রণালয় নিষ্পত্তি করবে না। এছাড়া অ্যালোকেশন অব বিজনেসেও বিদেশ মিশনে উইং বা পদ সৃজনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত গ্রহণের বাধ্যবাধকতার কথা বলা আছে। রুলস অব বিজনেস এবং অ্যালোকেশন অব বিজনেসের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেগুনবাগিচার একাধিক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন- আমরা কোনো ব্লেম গেমে যেতে চাই না। যার যে দায়িত্ব সেটি সততার সঙ্গে পালন করলেই হয়। পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তারা মঙ্গলগ্রহ কিংবা ভিন্ন গ্রহণের কেউ নয়। এদের প্রতিপক্ষ হিসাবে ভাবলে বা  দাঁড় করালে ব্যক্তিগতভাবে অনেকে লাভবান হবেন কিন্তু রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় এই বার্তাই দিতে চাই- সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের তরফে বিচ্ছিন্নভাবে যে সব অভিযোগ এসেছে তার সত্যতা বা যথার্থতা যাচাই করা হোক। অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা হোক। এটি দেশের স্বার্থেই হওয়া জরুরি। কিন্তু সামগ্রিকভাবে পররাষ্ট্র ক্যাডারকে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্য যে অকেস্ট্রেইডেট ক্যাম্পেইন চলছে সেটা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হোক। পররাষ্ট্র ক্যাডারের অস্তিত্ব সংকোচন এবং খর্ব করার এ অপচেষ্টা রোধে কেবিনেট ডিভিশনকে মুখ্য ভূমিকা নেয়ার অনুরোধও জানান তারা।

Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031