পৃথিবী ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে। এর প্রভাবে গলছে হিমবাহ। বৃদ্ধি পাচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এর ভয়াবহ এক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বঙ্গোপসাগর উপকূলে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে এসব অঞ্চলের কমপক্ষে ১৩ লাখ মানুষ ২০৫০ সালের মধ্যে এলাকা ছেড়ে দেশের অন্যান্য স্থানে ‘অভিবাসী’ হবে বা স্থানান্তরিত হবে। গণহারে এসব মানুষ উপকূল ছেড়ে আসতে পারেন। আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় এসব কথা বলা হয়েছে। নতুন গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে এ পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বঙ্গোপসাগর উপকূল সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ কারণে সাগরের লবণাক্ত পানি প্লাবিত করবে কৃষিজমি, মাছের ঘের, বসবাসের জনপদ। ডুবে যাবে বহু এলাকা। ফলে সেখানে মানুষ বসবাসের কোনো উপায় থাকবে না। তাই জীবনধারণের জন্য এসব অঞ্চলের মানুষ শহরমুখী বা দেশের অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়বেন। এতে আরো বলা হয়েছে, অনেক অভিবাসীকে তার বর্তমান আবাসন থেকে বাস্তুচ্যুত হতে হবে। এ কারণে গণহারে মানুষ এলাকা  ছাড়তে থাকবে। উল্লেখ্য, আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়ন হলো একটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক গ্রুপ। তারা বলেছে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা হলো এসব অভিবাসীর জন্য জনপ্রিয় স্থান। কিন্তু এত ঘনবসতি এবং মানুষের চাপে এখানকার অধিবাসীরা অন্য স্থানে সরে যেতে পারেন। এর ফলে ঢাকার জনসংখ্যা কমে আসতে পারে। বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য কমপক্ষে ৬০ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন এই শতাব্দীতে। এ অবস্থায় গবেষকরা বলছে, যখন ব্যাপক হারে অভিবাসীর ঢল নামবে শহরগুলোতে তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে তাদের এই মডেল বিভিন্ন দেশকে সহায়তা করবে। এর ফলে তারা তাদের শহরগুলোকে সেভাবে সরঞ্জামে সাজাবে।

এই গবেষণাপত্রের সহ-লেখক মৌরিজিও পরফিরি বুধবার রয়টার্সকে বলেছেন, আমাদের এই গবেষণাপত্র শুধুমাত্র সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে তাৎক্ষণিকভাবে যারা বাস্তুচ্যুত হবেন তাদের বিষয়টিই অনুধাবনে সহায়ক নয়। একই সঙ্গে এটা জানিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, এসব মানুষ সারাদেশে অভিবাসী হিসেবে ছড়িয়ে পড়বে। তিনি আরো বলেন, এই মডেল প্রাথমিকভাবে আপনাকে এটাই বলবে যে, প্রথমে অভিবাসীদের জন্য গন্তব্য হবে ঢাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটা মাথায় রাখতে হবে যে, ঢাকা অত্যধিক জনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে মানুষ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। সব জায়গায় অভিবাসীদের অংশবিশেষ ছড়িয়ে থাকবে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ কমপক্ষে ১৬ কোটি মানুষের একটি নিম্নভূমির দেশ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, চরমভাবাপন্ন ঘূর্ণিঝড় থেকে শুরু করে বন্যার ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে যেসব দেশ রয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। গত বছর বাংলাদেশ এমন এক বন্যা দেখেছে যা অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা করোনা ভাইরাস মহামারিতে বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। এতে অর্থনীতিতে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে।

ওই গবেষণার লেখকরা বলেছেন, তারা যে মডেল দাঁড় করিয়েছেন তাতে পরিবেশগত দুর্যোগ- খরা থেকে দাবানল, ভূমিকম্পের মতো যেকোন দুর্যোগে অভিবাসীদের প্রবণতা কি হতে পারে তা নিরূপণে ব্যবহৃত হতে পারে। ইতালির ইউনিভার্সিটি অব নেপলস ফেডেরিকো দ্বিতীয়-এর প্রকৌশলী ও এই গবেষণার শীর্ষ লেখক পিয়েত্রো ডে লিলিস বলেন, আমাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র মাধ্যম হলো গাণিতিক মডেল। ঢাকাভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পরিচালক সালিমুল হক বলেন, এই গবেষণায় মানব জাতির আচরণগত জটিল বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে, যার সঙ্গে ব্যাপক হারে অভিবাসী প্রক্রিয়াকে সামাল দেয়ার সিদ্ধান্ত জড়িত। ঢাকা ছাড়াও আমাদের দেশে যেসব শহর আছে সেগুলোকে প্রস্তুত করতে হবে ভবিষ্যতের এসব জলবায়ু বিষয়ক অভিবাসীদের গ্রহণের জন্য।

Share Now
September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930