দুইজন সিনিয়র নার্স করোনায় আক্রান্ত হয়ে দুই সপ্তাহ লড়াইয়ের পর হার মানলেন ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের । দুইজনই নার্সিং পেশায় কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। দুইজনেই তিন সন্তানের জননী। পেশাগত কাজে নিষ্ঠা ও দক্ষতা, বন্ধুবৎসল ও পরোপকারী মনোভাব এবং কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয়তায়ও দুইজনই ছিলেন সমানে সমান। বয়সের ব্যবধানও মাত্র তিন বছরের। মিডল্যান্ডের আরিমা নাসরীন ৩৬, কেন্টের আইমি ও রুরকি ৩৯। একদিনের ব্যবধানে দুই নার্সের মৃত্যু শোকগ্রস্ত করে তুলেছে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের কর্মীদের। পাশাপাশি এই ঘটনা সামনে নিয়ে এসেছে রোগির জীবন রক্ষায় তৎপর স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকির উচ্চমাত্রার বিষয়টি।

করোনা সংকট নিয়ে ডাউনিং স্ট্রিটের দৈনিক ব্রিফিংয়ে ইংল্যান্ডের চিফ নার্সিং অফিসার রুথ মে করোনা ভাইরাসে মৃত্যুবরণকারী এনএইচএস কর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন- ‘আজ আমাদের দুই সহকর্মীর মৃত্যুর খুব দুঃখজনক সংবাদ পেয়েছি। আমরা আজ অ্যামি ওউরউক এবং আরিমা নাসরিনকে হারিয়েছি। আমাদের জনসাধারণকে সুরক্ষিত করতে কাজ করা নিবন্ধিত দু’জন নার্স। দু:খজনকভাবে তারা মারা গেছেন। আমি তাদের সেবার স্বীকৃতি ও সম্মান জানাতে চাই। পাশাপাশি আমি আশঙ্কা করছি এমন আরো কিছু দু:খজনক ঘটনা ঘটতে পারে।’

ওয়াসাল ম্যানর হাসপাতালের সিনিয়র নার্স আরিমা নাসরীন। কর্মরত অবস্থায় ১৩ই মার্চ করোনার লক্ষণ দেখা দেয়ার পর তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে পরীক্ষা নিরাশার পর তার শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থতি ধরা পড়ে। এরপর ম্যানর হাসপাতালের ইন্টেনসিভ কেয়ারে চিকিত্সাধীন অবস্থায় শুক্রবার সকালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই ৩৬ বছর বয়স্ক তিন সন্তানের মা আরিমার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করছিলেন পুরো দেশের হাজার হাজার লোকজন। দুই সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে কোবিড-১৯ এর সঙ্গে লড়াই করছিলেন তিনি। হাসপাতালের ইন্টেনসিভ কেয়ারে তাকে ভেন্টিলেটরে রাখা হয়েছিল। গত সপ্তাহে তার অবস্থার কিছুটা উন্নতিও হয়েছিল। একই হাসাপাতালে কর্মরত আরিমার বোন কাজীমা আফজাল বলেন- ‘নিবিড় যত্নের সাথে চিকিৎসা ও দেশব্যাপী হাজার হাজার মানুষের শুভ কামনার পরও আরিমা নাসরীন কোভিড-১৯ এর সাথে লড়াইয়ে হেরে গেছেন। আমরা একসাথে সব কিছু করেছি। সে আমাকে একা রেখে চলে গেছে।‘ প্রয়াত নাসরীন অল্প বয়সে বিয়ে করেছিলেন এবং তিনটি সন্তান জন্ম দিয়েছেন। নার্সিংয়ে তার স্বপ্ন পূরণ করে একজন সফল নার্স হয়েছিলেন। তার কাজের প্রতি সম্পূর্ণরূপে নিবেদিত ছিলেন। মানুষ সাহায্য করার জন্য এগিয়ে যেতেন। সর্বোপরি তিনি এশীয় নারীদের কাছে দুর্দান্ত রোল মডেল ছিলেন।

গুড মর্নিং ব্রিটেনের হোস্ট ও সাবেক নিউজ পেপার এডিটর পাইয়ার্স ট্রাম্পটি টুইট করে বলেছেন-‘ শান্তিতে থাকুন আরিমা নাসরিন। আপনি একজন সত্যিকারের নায়িকা। একজন প্রেমময়ী স্ত্রী, তিন সন্তানের মায়ের পাশাপাশি যিনি ১৬ বছর ধরে এনএইচএস নার্স হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। যিনি হাসপাতালের অন্যদের জীবন রক্ষার লড়াই করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।’

বার্মিংহামের জিপি ডা. সামারা আফজাল বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্ককে বলেছেন- ‘এটি নাসরীনের পরিবারের জন্য একেবারে দু:খের সংবাদ। সবচেয়ে হ্নদয়বিদারক বিষয় হচ্ছে, করোনা মহামারি বিস্তারের প্রকৃতি ও তা প্রতিরোধে চলমান নির্দেশনার কারণে তার শিশুরা তাকে শেষবারের মতো দেখতেও পাবে না।’

এক আত্মীয় ব্ল্যাক কান্ট্রি লাইভকে বলেন- ‘আরিমা নাসরীনের প্রতিবেশীরা সবাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও আজ সকালে তার মৃত্যু সংবাদে সকলেই হতবাক হয়েছেন। আরিমা জীবন-যাপনে সবসময় পরিপূর্ণ ছিলেন। একজন নার্স হিসাবে তিনি তাঁর কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান ছিলেন। পেশা ও পরিবারই ছিলো তার ভালোবাসা। তিনি যা করতে (পেশা)পছন্দ করতেন তার মধ্যে থেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন। তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। তিনি একজন দুর্দান্ত মানুষ ছিলেন।’ এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর পরে, তার বিধ্বস্ত বন্ধুরা সোশ্যাল মিডিয়ায় আন্তরিক শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তাদের একজন সহকর্মী রুবি আক্তার লিখেছেন- ‘আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ এই জন্য যে, তাকে আমার সেরা বন্ধু হিসাবে অভিহিত করার গৌরব পেয়েছিলাম।তিনি আমাকে আমার সেরা এবং সবচেয়ে খারাপ সময়ে দেখেছিলেন। আমার প্রতিটি ত্রুটি গ্রহণ করেছেন। আমি এতটাই ভেঙে পড়েছি যে শব্দগুলি ব্যাখ্যা করতে পারে না I আমি বিশ্বাস করতে পারি না আমি আবার তার হাসি দেখতে পাব না।’

অন্যদিকে আইমি ও রুরকি নামে ৩৯ বছর বয়সী আরেকজন নার্স করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। কেন্টের মারগেট কুইন এলিজাবেথ ও কুইন মাদার (কিউইকিউএম) হাসপাতালে বৃহস্পতিবার মৃত্যুবরণ করেন। তিনিও বিবাহিত এবং তিন সন্তানের জননী ছিলেন। আইমির তিনটিই কন্যা সন্তান। তিনি তার কন্যা, পরিবার ও পেশাকে খুবই ভালবাসতেন। এই ছিল তার জগৎ।

আইমির ছোট মেয়ে মেগান শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছে- ‘আপনি একজন দেবদূত। আপনি আপনার এনএইচএস মুকুট চিরকাল পরিধান করবেন। যা আপনি অর্জন করেছেন। আপনার মেগি আপনাকে কতোটা অনুভব করছে বিশ্বাস করতে পারবেন না। একদিন যখন আমার নিজের সন্তান হবে তখন আমি আপনার নাতি-নাতনিদের তাদের জিজি (গ্ল্যামারাস গ্রান) সম্পর্কে বলব। যেগুলি আপনি প্রতিদিন তাদের ডাকতে চেয়েছিলেন!’

সহকর্মীরা গণমাধ্যমে দেয়া মূল্যায়নে আইমিকে এমন এক নার্স হিসাবে বর্ণনা করেছেন যিনি তার সমস্ত রোগীদের সর্বোত্তম যত্ন নিতে সবসময় দঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। ইস্ট কেন্ট হাসপাতাল বিশ্ববিদ্যালয় এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের প্রধান নার্স আমানদা হলামস বলেন- ‘ আইমির সাথে যারা কাজ করেছেন তাদের জন্য তার মৃত্যুর খবরটি হৃদয়বিদারক ছিল। আমরা একটি পরিবারের মতো কাজ করতাম।

Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031