নয়াদিল্লি কাশ্মীরের পাকিস্তান অংশে সামরিক হামলার পর পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবেও চাপে রাখতে পদক্ষেপ নেয়ার কথা বিবেচনা করছে । বিবেচনায় রয়েছে পাকিস্তানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়টি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনীতি দিয়েও পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টির কথা বিবেচনা করছে দিল্লি। ভারতীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। খবরে বলা হয়, ভারতীয় কর্মকর্তারা তাদের বিশেষ বাহিনীর পাকিস্তানের সীমান্তে ঢুকে পড়ে জঙ্গি আস্তানায় হানা দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন। এই হামলায় কয়েকজন জঙ্গি নিহত হয়েছে, যারা ভারতের প্রধান প্রধান শহরে হামলার পরিকল্পনা করছিল বলে মনে করছেন তারা। এ মাসের শুরুতে কাশ্মীরের ভারতীয় অংশে উরি ঘাঁটিতে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিদের হামলার সরাসরি জবাব ভারতের এই হামলা। তবে পাকিস্তান ভারতের এই হামলার কথা অস্বীকার করেছে। দেশটি বলছে, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে কোনো ধরনের সমস্যা উদ্রেকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় তারা। বরং পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার যে অভিযোগ ভারত করছে, তার সপক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ হাজির করাার দাবি করেছে পাকিস্তান। কিছু ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন, পাকিস্তানে আরও হামলা বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক সামরিক কার্যক্রমের পরিকল্পনা নেই তাদের। তবে তারা জানিয়েছেন, নরেন্দ্র মোদির সরকার দিল্লির অগ্রসরমান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ব্যবহার করে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করা যায় কি না তা বিবেচনা করছে। উরি হামলার পর থেকে ভারতের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বৈঠকে প্রতিদিন উপস্থিত একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘সীমান্ত পেরিয়ে ১০-১২ জনকে হত্যা করাই কেবল লক্ষ্য নয়। লক্ষ্য হলো পাকিস্তানের আচরণে পরিবর্তন আনা এবং এর জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করতে হবে। জাতীয় ক্ষমতার সবকিছুকেই এই কৌশলে সংশ্লিষ্ট করা হবে। এর মধ্যে সামরিক বাহিনীর ব্যবহার একটি।’ এসব পরিকল্পনার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো তৃতীয় সব দেশগুলোর মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে তা ছিন্ন করার কথা রয়েছে বিবেচনায়। ভারত থেকে পাকিস্তানে যেসব নদী প্রবাহিত হচ্ছে সেগুলোতে বাঁধ দেয়ার কথাও ভাবছে দিল্লি। জঙ্গিরা পাকিস্তানকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে সারাবিশ্বকেই কীভাবে প্রভাবিত করছে, তা তুলে পাকিস্তানের ওপর কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধির কথাও রয়েছে আলোচনায়। একজন কর্মকর্তা বলেন, পাকিস্তানে ব্যবসা না করার জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকেও বুঝিয়ে রাজি করাতে পারে ভারত।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, নরেন্দ্র মোদির জাতীয়তাবাদী সরকারের অধীনে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপ নেয়ার কথা বিবেচনা করছে তা আগের সরকারের তুলনায় অনেক বেশি প্রত্যয়ী। তবে এতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকিও রয়েছে। ভারতের সাম্প্রতিক সময়ের সরকারগুলো সামরিক হামলা থেকে বিরত থেকেছে। ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পরেও সামরিক হামলা চালায়নি ভারত। আশঙ্কা ছিল, এটা পাকিস্তানকে প্রতিশোধপরায়ণতার দিকে ঠেলে দিতে পার এবং সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতি হিসেবে পারমাণবিক যুদ্ধও বাঁধিয়ে দিতে পারে। ভারতীয় একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা দেশটির নতুন ধরনের এই আচরণকে ‘রক্ষণাত্মক ভঙ্গি থেকে রক্ষণাত্মক আক্রমণে’র দিকে ধাবিত হওয়া বলে বর্ণনা করেছেন। এতে পাকিস্তানের অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ, নিরাপত্তা এবং অস্থিতিশীল জাতি ও ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর ভূমি হিসেবে দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির মতো দুর্বল দিকগুলো নিয়ে কাজ করছে ভারত। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের দুর্বলতা ভারতের চেয়ে অনেকগুণ বেশি।’ বৃহস্পতিবারের হামলার কয়েক ঘণ্টা পর ভারত সরকারে একজন কর্মকর্তা বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যসহ অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েই পুনর্বিবেচনা করছে নয়াদিল্লি। তিনি অবশ্য ভারতের পক্ষ থেকে দুই দেশের মধ্যে যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। নীতি নির্ধারণের বাস্তবতা অতটা অপরিমিত নয় বলে জানান তিনি।
২০১৪ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ২৬০ কোটি ডলারের বাণিজ্য ছিল। আনুষ্ঠানিক এই হিসাবের বাইরে অনানুষ্ঠানিক হিসাবকে জুড়লে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০০ কোটি ডলার। দুবাইয়ের মতো তৃতীয় কোনো দেশের বন্দর ব্যবহার করে ভারত থেকে পাকিস্তানে অলংকার, পোশাক ও যন্ত্রপাতি রপ্তানি হয়ে থাকে। অন্যদিকে পাকিস্তান থেকে ভারত অনানুষ্ঠানিকভাবে আমদানি করে থাকে পোশাক, শুকনো ফল, মশলা ও সিমেন্ট। এসব বাণিজ্যে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সাবেক অনেক প্রভাবশালী কর্মকর্তারাও জড়িত রয়েছেন বলে মনে করা হয়। ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকারীরা বলছেন, এই বাণিজ্য বন্ধ করলে পাকিস্তানের ওপর চাপ বাড়ানোয় সহায়ক হবে।  পাকিস্তানের বিনিয়োগ বোর্ডের প্রধান মিফতাহ ইসমাইল বলেন, নিষেধাজ্ঞা সাধারণত বিশ্বের অন্য কোথায় খাটেনি। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ খুব বেশি নয়। এবং যেহেতু এর বেশিরভাগই যায় ভারতের পক্ষে, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে পাকিস্তানের চেয়ে ভারতই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ইসমাইল বলেন, ‘ভারত যদি এটা করে (অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ), পাকিস্তান কোনো না কোনোভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। এবং আমরা দুই দেশের জনগণকেই আরও নিঃস্ব করব। এর থেকে ভালো কিছু হবে বলে আমি মনে করছি না।’

Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031