কুমিল্লায় পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত সন্দেহভাজন ১৩ জন মাদক চোরাকারবারির সবাই বিভিন্ন মামলার আসামি মাদকবিরোধী অভিযানে । মাদক ছাড়াও ডাকাতি, সন্ত্রাস, চোরাচালান ও হত্যার অভিযোগে করা হয় এসব মামলা।

যারা নিহত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে সর্বনিম্ন পাঁচটি থেকে সর্বোচ্চ ১৬টি মামলা ছিল। তাদের কেউ দীর্ঘদিন ধরে পলাতক, কেউ জামিনে মুক্ত হয়ে আর হাজিরা দেননি।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা গ্রেপ্তার করে পুলিশে দিয়েছি। বিচারিক আদালতে জামিন হয়নি, কিন্তু তারা হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে মুক্ত হয়েছে। এরপর তারা ভেবেছে আর কিছুই হবে না। এ কারণে তারা বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিল।’

অভিযানের কারণে কুমিল্লায় চিহ্নিত মাদকের কারবারি বা মাদকাসক্তদের প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না বলেও জানান ওই পুলিশ কর্মকর্তা। জানান, তাদের অভিযানে কেবল প্রাণহানি হয়নি। কয়েকশ মাদক কারবারি বা মাদকাসক্ত আটকও হয়েছে কুমিল্লায়। এই সংখ্যাটা নিশ্চিতভাবেই তিনশর বেশি বলে জানান ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

‘বন্দুকযুদ্ধে’ কুমিল্লা কোতয়ালি মডেল থানায় তিনজন, সদর দক্ষিণ থানায় দুইজন, চৌদ্দগ্রাম থানায় এক জন, বুড়িচং থানায় দুইজন, ব্রাহ্মণপাড়া থানায় দুইজন, দেবিদ্বার থানায় একজন এবং মুরাদনগর থানায় দুইজন নিহত হয়।

পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারাদের দাবি, যারা নিহত হয়েছেন, তারাই এলাকায় মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণ করতেন। তারা সবাই তালিকাভুক্ত মাদকের কারবারির পাশাপাশি সন্ত্রাসের দায়ে অভিযুক্ত।

এই ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনাগুলো ঘটেছে গত ২২ মে থেকে ৩০ মে পর্যন্ত। প্রতিটি ঘটনাই ঘটেছে গভীর রাতে। আর কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও মিলছে না।

গত ২২ মে কুমিল্লা সদরের সীমান্তবর্তী এলাকা বিবির বাজার সংলগ্ন অরণ্যপুরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন মোহাম্মদ শরীফ ও পিয়ার আলী নামে দুইজন।

এদের মধ্যে শরীফের বিরুদ্ধে বাড়ি সদর দক্ষিণ উপজেলার মহেষপুর গ্রামে। তার বিরুদ্ধে মাদকের পাঁচটি মামলা ছিল। পিয়ার আলীর বিরুদ্ধে একটি হত্যাসহ ১২টি মাদকের মামলা ছিল। তার বাড়ি আদর্শ সদর উপজেলার শুভপুর গ্রামে।

২৩ মে দিবাগত রাতে কুমিল্লা সদরের টিক্কারচর ব্রিজ এলাকায় গুলিতে নিহত হন নুরুল ইসলাম ইছা। তার বিরুদ্ধে মাদকের মামলা ছিল পাঁচটি। তার বাড়ি আদর্শ সদর উপজেলার গাজীপুর গ্রামে।

পরের রাতে চৌদ্দগ্রামের আমানণ্ডায় প্রাণ হারান বাবুল মিয়া ওরফে লম্বা বাবুল। তার বিরুদ্ধে মাদকের পাঁচটির পাশাপাশি ডাকাতির মামলা রয়েছে একটি। তার বাড়ি চৌদ্দগ্রাম পৌর এলাকায়।

২৪ মে রাতে সদর দক্ষিণ উপজেলার গোয়ালমথন এলাকায় নিহত হন রাজিব। তার বিরুদ্ধে থানায় ১৩টি মাদক ও চোরাচালানের মামলা ছিল। তিনি সদর দক্ষিণ উপজেলার কোটবাড়ি সংলগ্ন চাঙ্গিনী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।

২৫ মে বুড়িচং উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের মহিষমারা এলাকায় কামাল হোসেন প্রকাশ নিহত হন। তার বিরুদ্ধে বুড়িচং ও কোতয়ালী মডেল থানায় ১২টির বেশি মাদকের মামলার খোঁজ পাওয়া গেছে। তার বাড়ি ছিল আদর্শ সদর উপজেলার রাজমঙ্গলপুর গ্রামে।

২৭ মে জেলার ব্রাহ্মণপাড়ার বাগরা এলাকায় নিহত বাবুলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি মামলা পাওয়া গেছে। এই সংখ্যা অন্তত ১৬ বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার বাড়ি ব্রাহ্মণপাড়ার আশাবাড়ি গ্রামে।

একই রাতে প্রাণ হারানো আলমাসের বিরুদ্ধে মাদকের মামলা পাওয়া গেছে আটটি। তার বাড়ি ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার দক্ষিণ তেতাভূমি গ্রামে।

২৮ মে দেবিদ্বারের পশ্চিম ভিংলাবাড়ি এলাকায় নিহত এনামুল হক ভূইয়া ওরফে দোলনের বিরুদ্ধে দেবিদ্বার ও মুরাদনগর থানায় ১২টি মাদকের মামলা পাওয়া গেছে।

একই রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলায় গলিয়ারায় নিহত মোহাম্মদ নুরু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি। তার বিরুদ্ধে ১১টি মাদক ও একটি অস্ত্র মামলার সন্ধান পাওয়া গেছে।

২৯ মে মুরাদনগর উপজেলার গুঞ্জুর এলাকায় লিটন ওরফে কানা লিটনের বিরুদ্ধে মাদকের সাতটি মামলার তথ্য নিশ্চিত করেছে থানা পুলিশ। তার বাড়ি মুরাদনগরেরই পৈয়াপাথর এলাকায়।

একই রাতে নিহত বাতেনের বিরুদ্ধে মাদকের মামলা ছিল আটটি। তার বাড়িও মুরাদনগরের বাখরনগর গ্রামে।

আর ৩০ মে বুড়িচং উপজেলার লড়িবাগ এলাকায় গুলিবিব্ধ হয়ে নিহত হন রোছমত আলী। তার বাড়ি উপজেলার ছয়গ্রাম এলাকায়। তিনিও একজন তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি আর তার বিরুদ্ধে মামলা পাওয়া হেছে সাতটি।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র জানায়, কুমিল্লার ১৭ উপজেলার মাদক কারবারিদেরকে নাম আছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা তালিকায়। যারা নিহত হয়েছেন, তারা সবাই এই তালিকার। তালিকায় থাকা মাদকের কারবারিদের মধ্যে বেশিরভাগই কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা, চৌদ্দগ্রাম, বুড়িচং, সদর দক্ষিণ এবং ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বাসিন্দা।

অভিযানে মাদকের নিয়ন্ত্রকরা নিহত বা ধরা পড়ছেন কি না- জানতে চাইলে, কুমিল্লা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, আইজিপির দেওয়া নির্দেশ অনুসারে এক রমজান থেকে ১০ রমজান পর্যন্ত মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চলেছে। এই অভিযানে সাত উপজেলায় ১৩ জন শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে।

তবে কিছু কিছু মাদক কারবারি আত্মগোপনে রয়েছে জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘তাদেরকেও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’

আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, তার জেলায় মাদকের কারবারে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ জড়িত। এর মধ্যে পুলিশ, সাংবাদিক, রাজনৈতিকও থাকতে পারেন। এসব পেশার লোকজন মাদক কারবারিদেরকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে থাকেন। তাদেরকেও এই অভিযানের আওতায় আনা হবে।

Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031