সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংজনরায়কে উপেক্ষা করলেন মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও তিনি বললেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নতুন নির্বাচনের। সেই নির্বাচনে যিনি বিজয়ী হবেন তার হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। তবে তার এ বক্তব্য বিরোধীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তিনি যখন টিভিতে বক্তব্য রাখছিলেন, তখন টিভির স্ক্রিনের সামনে সাধারণ মানুষকে তাদের ঘরে ব্যবহার্য জিনিসপত্র নিয়ে তা বাজাতে দেখা গেছে। ১লা ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত অং সান সুচির সরকারকে উৎখাত করে তিনি ক্ষমতা দখল করেন। এরপর প্রথমবারের মতো টিভিতে বক্তব্য রাখেন সোমবার।

এ সময় তিনি অভ্যুত্থানের পক্ষে সাফাই গান। অন্যদিকে তাদের হাতে আটক অং সান সুচির সঙ্গে সোমবার সাক্ষাতের চেষ্টা করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। কিন্তু সামরিক জান্তা তাদের এমন অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। এরই মধ্যে তৃতীয় দিনের মতো সোমবার সেখানে বিক্ষোভ প্রতিবাদে মানুষের ঢল নামে। কিন্তু সামরিক জান্তা এরই মধ্যে অনেক এলাকায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কারফিউ এবং সমাবেশে সীমিত পরিমাণ মানুষের উপস্থিতি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের বক্তব্যে তার অভ্যুত্থানের পক্ষেই বেশি জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন। তার দাবি, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনে অনিয়মের তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তারা সুষ্ঠু প্রচারণা চালাতে দেয়নি। জবাবে নির্বাচন কমিশন আগেই বলেছে, কোনো অনিয়মের প্রমাণ নেই তাদের কাছে।
জেনারেল মিং অং হ্লাইং এদিন সবুজ সামরিক পোশাক পরে টেলিভিশনে উপস্থিত হন। প্রতিশ্রুতি দেন নির্বাচন কমিশনকে সংস্কার করার। তিনি আরো বলেন, ৪৯ বছর ধরে সেনাবাহিনী যেভাবে মিয়ানমারে ক্ষমতা কব্জা করেছিল তা থেকে তার শাসন হবে ভিন্ন। ওই শাসন ব্যবস্থা ১৯৮৮ সালে এবং ২০০৭ সালে নির্মম দমনপীড়ন চালিয়েছিল। তিনি প্রকৃত এবং শৃংখলাবদ্ধ গণতন্ত্র অর্জনের কথা বলেন। তিনি নাগরিকদের সত্যের সঙ্গে চলার অনুরোধ জানান। তবে তিনি এদিন বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো হুমকি দেননি। বলেছেন, কেউই আইনের শাসনের ঊর্ধ্বে নয়। ওদিকে কিছু এলাকা অবরুদ্ধ হয়ে আছে। ইয়াঙ্গুন এবং মান্দালয়ের মতো অনেক এলাকায় রাত ৮টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত কারফিউ দেয়া হয়েছে। এসব এলাকায় ৫ জনের বেশি মানুষের সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর আগে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সতর্কতা দিয়ে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ধ্বংস, নষ্ট করা এবং এতে বিঘœ ঘটালে, জননিরাপত্তা এবং আইন শৃংখলা নষ্ট করলে আইন অনুযায়ী অপরাধীদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়া হবে।
এ বিষয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপপরিচালক ফিল রবার্টসন বলেছেন, সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানো একটি সামরিক সরকার গণতন্ত্রকে এবং আইন শৃংখলাকে পদদলিত করে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে তাদের আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার অধিকার আছে এমন দাবি করা উদ্ভট ব্যাপার। ওদিকে সোমবারও রাজধানী ন্যাপিডতে বিক্ষোভ করেছেন লাখো মানুষ। একই রকম বিক্ষোভ হয়েছে মান্দালয় ও ইয়াঙ্গুনের মতো বড় শহরগুলোতে। এসব বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন শিক্ষক, আইনজীবী, ব্যাংক কর্মকর্তা ও সরকারি কর্মকর্তারা। অনলাইনে জনগণকে কাজ ফেলে বিক্ষোভে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এমন আহ্বানে হনিন হেম্যান সোয়ে বিবিসিকে বলেছেন, তিনি নিজের সন্তান, ভাইপো-ভাইঝিদের সঙ্গে নিয়ে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। বিক্ষোভে যোগ দেয়া একজন চিকিৎসক বলেছেন, আমরা পেশাদার- বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী- ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং শিক্ষকরা এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য একটাই- স্বৈরাচারের পতন হোক। এ বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন এ প্রজন্মের তরুণ তরুণী। বিশেষ করে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার বিরুদ্ধে তারা জোরালো বিক্ষোভ করছে। তারা বলছে, তারা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে খুব বাজে অবস্থায় আছেন। কেউ কেউ তার প্রিয়তমা বা প্রিয়তমের সঙ্গে কথা বলতে পারছেন না। এ জন্য তাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
গত সপ্তাহে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। সঙ্গে সঙ্গে তারা এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করে মিয়ানমারে। আটক করে অং সান সুচি, প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট, সুচির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) সিনিয়র নেতাকর্মীদের। এ অবস্থার নিন্দা জানিয়েছে সারাবিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, মিয়ানমারের জনগণের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও বিক্ষোভের অধিকারের পক্ষে অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের। অন্যদিকে অং সান সুচির অস্ট্রেলিয়ান অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা সিন টার্নেলকেও আটক করা হয়েছে। সোমবার তার পরিবার ফেসবুকে একটি ওপোস্ট দিয়ে অবিলম্বে তার মুক্তি দাবি করেছে।

Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031