রোহিঙ্গা সংকটে ভারত বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে নয় বলে দাবি করেছেন দেশটিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী। তিন দিনের রাষ্ট্রদূত সম্মেলনে যোগ দিতে আসা মোয়াজ্জেম ঢাকাটাইমসের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনেও ভারতের সহযোগিতা পাওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।

সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের দূতাবাসে কর্মরত ছিলেন। ওই সময় তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা দেন এবং ওয়াশিংটনে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের দূতাবাস প্রতিষ্ঠা করেন।

মোয়াজ্জেম আলী ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন। তিনি ভুটান, ইরান ও ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন। ওয়াশিংটন, ওয়ারশ, জেদ্দার পাশাপাশি নয়াদিল্লি মিশনেও তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০০১ সালে পররাষ্ট্রসচিবের দায়িত্ব পালনের পর অবসরে যান এই কূটনীতিক। ২০১৪ সালের অক্টোবরে তিন বছরের চুক্তিতে হাইকমিশনার পদে নিয়োগ পান এই  কূটনীতিক।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি কেমন?

আমরা প্রধানমন্ত্রীর দিক নির্দেশনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় অংশগ্রহণে আড়াই মাসের মতো সময়ে একটা এমইউ সই করেছি। এটা খুব গুরত্বপূর্ণ স্টেপ ছিল, এতে মিয়ানমারের উপর আমরা একটা চাপ রাখতে পেরেছি। রোহিঙ্গারা ৭৮, ৮২, ৯২, ২০১২ সালেও এসেছিল। তখন কিন্তু সিকিউরিটি কাউন্সিলের জন্য আলাপ করা হয়নি। কখনও বিশ্ব একমত হয়নি, যার কারণে মিনিয়ানমার অতটা চাপে ছিল না। আমি মনে করি ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ মিয়ানমারের ওপর চাপ দিয়েছে। আমরা যদি ঠিকমত গিয়ারআপ করতে পারি তাহলে আমরা অসাধ্য সাধন করতে পারব।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান আসলে আসলে কী?

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের সাথে আমাদের সহযোগিতা আছে। রোহিঙ্গা শিবিরে এখন পর্যন্ত যেসব সাহায়্য এসেছে বাহির থেকে তার মধ্যে ভারতের সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয়ত রোহিঙ্গা পুনর্বাসন কেন্দ্র নিয়ে ভারত যথেষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছে, তারা করবে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন কোন পর্যায়ে?

বাংলাদেশ-ভারত প্রতিবেশী দেশ। একে অপরের সাথে হাজার হাজার বছর ধরে ছিলাম, থাকব, থাকতে হবে। তাদের সাথে সৎভাব রেখে চলাই ভাল। যেহেতু বিভিন্ন ইস্যুতে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।

আমি ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক গত তিন বছরে চরম উন্নতির দিকেই দেখেছি। কিছুদিন আগে ভারত বাংলাদেশকে তৃতীয়বারের মতো বড় অঙ্কের ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে যা এখন পর্যন্ত অন্য কোন দেশকে দেয়নি।

একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বর্তমান বাংলাদেশকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

একমাত্র আয়তনে বাংলাদেশ ছোট দেশ, কিন্তু সব দিক বিবেচনা করে বলছি বাংলাদেশ ছোট দেশ নয়। কারণ বাংলাদেশ সবদিকেই ’ইজ ওয়ান অব দ্য লার্জেস্ট কান্ট্রি’। বাংলাদেশতো আজ তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। আজ বাংলাদেশ উদীয়মান অর্থনীতি, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ, চতুর্থ বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী, পঞ্চম সর্বোচ্চ মাছ উৎপাদনকারী, চামড়া উৎপাদনেও আমাদের অবস্থান ছয়-এ। ফলের দিক দিয়েও আমাদের অবস্থা দুইয়ে।

প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রদূত সম্মেলনের হচ্ছে। এর আগে সরকারের বার্তা কীভাবে পেত দূতাবাসগুলো?

এর আগে আমাদের দেশে এ ধরনের বড় আকারে কূটনৈতিক সম্মেলন হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো আয়োজিত এ সম্মেলন একটা ইউনিক স্টোরি। কারণ এর আগে আমাদের যে ইনভয়েস কনফারেন্স হত সেগুলোতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিলে আমরা ইউরোপীয় অ্যাম্বাসেডরদের বলতাম সবাই এক জায়গায় সমন্বিত হওয়ার জন্য। এ সম্মেলনে ৫৮ দেশে দায়িত্ব পালনরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও আবাসিক প্রতিনিধি, সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কূটনীতিকদের উদ্দেশ্যে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার দিক-নির্দেশনামূলক আলোচনা করছেন, করবেন।

এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য কী?

বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা। বিশেষ করে এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে কী ধরনের দিক নির্দেশনার প্রয়োজন এবং সেটা নিয়ে কাজ করা। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে ফরেন পলিসি নিয়ে রাষ্ট্রদূতদের যে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন তারা সেটা গভীর মনযোগের সঙ্গে শুনেছি। এখানে বিভিন্ন ওয়ার্কিং সেশন চলছে, সেগুলোতে বিভিন্ন ইস্যুর উপর ফোকাস করা হয়েছে। বিভিন্ন সেক্টরে আমাদের অর্জন কী, কোন কোন জায়গায় গুরত্ব দিতে হবে, কোন কোন এলাকায় ইনভেস্টমেন্ট বাড়াতে হবে এগুলো নিয়ে আলোচনা করা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা। এতে করে আমরা জানতে পারছি আমরা কোন স্টেজে আছি এবং কোন কোন জায়গায় কোন ধরনের ইনভেস্টমেন্ট প্রয়োজন।

যেমন আমাদের এক্সপোর্ট প্লেইটটা খুব ছোট। আমরা মাত্র কয়েকটা আইটেম এক্সপোর্ট করছি। এখানে বাণিজ্যমন্ত্রীর সাথে আলোচনা হয়েছে কীভাবে আমাদের এক্সপোর্ট বাড়ানো যেতে পারে। এনার্জি সেক্টর, আইসিটি সেক্টরকে কীভাবে সামনে এগিয়ে নিতে পারি। তিন দিনের এই কনফারেন্সে বিভিন্ন সেক্টরের উপর আমরা একে অপরের সাথে মতবিনিময় করেছি।

এই সম্মেলনে রাজনৈতিক কোন ইস্যু বিশেষ করে নির্বাচন নিয়ে কোন কথা হচ্ছে?

না, রাজনৈতিক কোনো কেমপেইনের জন্য আমরা কাজ করছি না। রাজনৈতিক কোনো বিষয়ে আলাপ করিনি। এখানে মূলত দেশের উন্নতি কী হয়েছে এবং কীভাবে এই উন্নতিকে সামনে নিয়ে যাওয়া যায় সেটা নিয়েই আলোচনা হয়েছে। আমাদের দেশে যেসব অর্জন সেগুলোকে তুলে ধরা হয়েছে।

যেমন আমাদের কয়জন জানেন আমাদের জিডিপি ২০১০ থেকে ১৭ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়েছে। আমরা কয়জন জানি আমাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে সক্ষমতা পাঁচ গুণ বেড়েছে? আমরা কজন জানি আমাদের কৃষি উৎপাদন, মৎস্য উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়েছে? এই যে তথ্যগুলো এগুলো তো আমাদের দরকার।

আপনাকে ধন্যবাদ।

Share Now
September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930