রাইড শেয়ারিং অ্যাপে মোটর বাইক ব্যবহারের জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলছে শহরের অসহনীয় যানজট ঠেলে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর কারণে ।

অ্যাপ ভিত্তিক হওয়ায় একদিকে যেমন দর কষাকষির ঝক্কি নেই।

তেমনি বিভিন্ন অফারের আওতায় তুলনামূলক কম খরচে গন্তব্যে পৌঁছানো যায় বলে তরুণ সমাজে নির্ভরতার জায়গায় পরিণত হয়েছে এই অ্যাপগুলো।

আর সে কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলোর আওতাধীন মোটরসাইকেলের সংখ্যাও বাড়ছে সমান তালে।

তবে সম্প্রতি কয়েকটি দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ভাবিয়ে তুলেছে এই মোটর বাইক ব্যবহারের নিরাপত্তা প্রসঙ্গটি।

রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সানজানা নওরিন প্রায়ই মোটর বাইক রাইডে অফিসে আসেন। বাইকের ফিটনেস সেইসঙ্গে হেলমেট না দেয়াসহ তাদের সেবা নিয়ে অসন্তুষ্টির কথাও জানান তিনি। মিসেস নওরিন বলেন,

“কিছু কিছু বাইকের অবস্থা খুবই খারাপ থাকে। আবার রাইডার নিজেরা হেলমেট পরলেও আমাদের জন্য কোন হেলমেট রাখে না। কেউ যদি রাখেও সেটার এমনই অবস্থা থাকে যে ওটা আর পরার মতো না। হেলমেট না থাকার কারণে ক্যান্টনমেন্ট রুটও ব্যবহার করতে পারিনা আমি।”

গতকাল এক রাইড অ্যাপ ব্যবহারকারী এয়ারপোর্ট রোডে কাছে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন।

সম্প্রতি মোটর রাইড ব্যবহার করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন সংগীত শিল্পী নাদেদজা সুলতানা আর্নিক।

এসময় তিনি চালকদের দক্ষতাসহ তাদের বেপরোয়া গতি এবং চালকদের অসচেতনতাকে দায়ী করেন।

মিজ আর্নিক বলেন, “অনেকে কোন রকম বাইক চালাতে পারলেই রাস্তায় নেমে যান। অনেক বেপরোয়াভাবে চালান। আস্তে যেতে বললেও লাভ হয়না। আমি অ্যাক্সিডেন্টের পর রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানে লিখিত অভিযোগ করেছি। পরে তারা কোন ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা জানিনা।”

রাইড ব্যবহারের এই বিরূপ অভিজ্ঞতার ব্যাপারে কোথায় জানাতে হবে, কিভাবে জানাতে হবে এমন বিষয়ে বেশিরভাগেরই কোন ধারণা নেই।

এসব অ্যাপ ঘেঁটে যাত্রীদের অভিযোগ বা প্রয়োজনীয় সাহায্যের জন্য কোন হটলাইন নম্বর পাওয়া যায়নি। এজন্য যাত্রীরা সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের সমস্যা বুঝিয়ে বলার সুযোগ পাচ্ছেননা।
এ ব্যাপারে পাঠাওয়ের জনসংযোগ কমকর্তা নাফিউল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, সার্ভিসটির ওয়েবসাইটে তাদের হেল্প লাইন নাম্বার দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া যাত্রীদের নিরাপত্তার দিকটি বিবেচনায় চালক নিয়োগের ক্ষেত্রে তারা কি নীতিমালা মেনে চলছে এমন প্রশ্ন রাখা হলে মিস্টার ইসলাম জানান, “চালকদের বৈধ লাইসেন্স, মোটর সাইকেলের ফিটনেস এবং এটি চালানো দক্ষতা পরীক্ষার ভিত্তিতে আমরা নিয়োগ দিয়ে থাকি। প্রত্যেককেই হেলমেট ব্যবহার করতে এবং যাত্রীকে হেলমেট সরবরাহ করতে বলা হয়। এছাড়া আমাদের বিশেষ টিম জিপিএস ট্র্যাকিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে রাইডারদের নজরে রাখে।”

তবে সরেজমিনে অনেক নীতিমালার কোন প্রয়োগ দেখা যায়না। এক্ষেত্রে গ্রাহকদের রেটিংয়ের ভিত্তিতে রাইডারদের পারফর্মেন্স যাচাই বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান তিনি।

“কোন রাইডারের রেটিং বারবার খারাপ আসলে, কেউ পর পর তিন মাস যাত্রীকে হেলমেট না দিলে, আবার রাইডার যে মোটর সাইকেল দেখিয়ে নিবন্ধন করেছে সেটার পরিবর্তে অন্য কোন মোটর বাইক ব্যবহার করলে তাদের নিবন্ধন বাতিল করে দেয়া হয়।”

তবে লাইসেন্স যাচাই বাছাই যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ডক্টর মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, এই রাইডগুলোকে একটি নীতিমালার আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, “কেউ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে যে লাইসেন্স ব্যবহার করে সেটা এইসব অ্যাপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়। কেননা এখানে অনেক পেশাদারি চালক আছেন। তাদের সেই বিশেষায়িত লাইসেন্সের প্রয়োজন। এছাড়াও চালকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাইয়ের মাধ্যমে তাদের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। কোন চালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেগুলো খতিয়ে দেখাও প্রয়োজন এবং এই দায়িত্ব নিতে হবে সংশ্লিষ্ট অ্যাপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। সরকার সংশ্লিষ্টদেরও উচিত বিষয়গুলো তদারকি করা।”

তবে এক্ষেত্রে অ্যাপ ব্যবহারকারীদের সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

মি. হোসেন বলেন, “সবার আগে দেখে নিতে হবে অ্যাপে যে লাইসেন্স নম্বর দেখানো সেটা বাইকের সঙ্গে মিলছে কিনা। চালককে বাইরে থেকে দেখে বা কথা বলে বুঝতে হবে তিনি মোটর বাইক চালানোর অবস্থায় আছেন কিনা। বাইকের ফিটনেস ভালো না হলে এবং হেলমেট ছাড়া বাইকে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ।”

প্রয়োজনে চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা করারও পরামর্শ দেন তিনি।

সম্প্রতি চালক ও যাত্রীদের বিনামূল্যে বীমা সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে উবার।

তাদের বীমা নীতি অনুযায়ী, রাইড ব্যবহারের সময় যদি কোন দুর্ঘটনায় উবার ব্যবহারকারী বা চালক মৃত্যুবরণ করেন, স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করেন অথবা হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তাহলে তাদের এই ফ্রি বীমার সুবিধা দেয়া হবে।

এই সুবিধার আওতায় দুর্ঘটনায় উবার ব্যবহারকারীর মৃত্যু হলে ২ লাখ টাকা, স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে গেলে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা এবং হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।

তবে এই বীমা সেবার ব্যাপারে পাঠাও-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা প্রথম ১,০০০ চালককে বীমার আওতায় এনেছে। এছাড়া যাত্রী ও বাকি চালকদের এর আওতায় আনার কাজ চলছে।

এদিকে ব্যক্তিগত মোটরযান ভাড়ায় চালানোর বিষয়টিকে একটি বিধিমালার আওতায় আনতে রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালার খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।

এই নীতিমালাকে গ্রাহকরা ইতিবাচকভাবে দেখলেও এতে যেন সেবার সহজলভ্যতা এবং ভাড়ায় কোন প্রভাব না পড়ে সেদিকে লক্ষ্য রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সুত্র- বিবিসি বাংলা

Share Now
September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930