যেদিকে তাকাই, সেদিকেই ভেজাল।  ভেজাল খেয়ে আমাদের জীবন এখন পর্যুদস্ত। চিকিৎসায় ভেজাল, কথায় ভেজাল, রাজনীতিতে ভেজাল, এমন কি ওষুধেও ভেজাল। নকল ভেজাল যেন সব কিছুকে গ্রাস করতে চলেছে। খাদ্যপণ্য থেকে দৈনন্দিন ব্যবহার্য ইলেকট্রনিক্স পণ্য কিনতে গিয়ে সেটি আসল না নকল তা নিয়ে গ্রাহকরা হিমশিম খাচ্ছেন। দেশে যে খাবার পণ্য বিক্রি হয় সেখানে নকল ভেজালের দৌরাত্ম্য সীমা অতিক্রম করে চলেছে। কোনোভাবেই বাগে আনা যাচ্ছে না ভেজাল খাবারের কারবারিদের। প্রসাধনীর ক্ষেত্রে নকল ভেজালের দৌরাত্ম্যের কোনো সীমা নেই। বাজারে নামীদামি যে সব প্রসাধনী বিক্রি হচ্ছে তার সিংহভাগই নকল। বলা যায়, বাজারের প্রায় প্রতিটি খাদ্যপণ্যই ভেজালে আক্রান্ত। আগের মতো জোরালোভাবে এখন আর অভিযান পরিচালিত হচ্ছে না। আর এ সুযোগে ভেজালকারীরা মহা–উৎসাহে ভেজাল খাদ্য তৈরিতে নেমে পড়েছে। খাদ্যে মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত সব রাসায়নিক দ্রব্য। এই ভেজাল খাবার খেয়ে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ক্যান্সার কিংবা কিডনি ও লিভার অকেজো হয়ে পড়াসহ নানা রকম দুরারোগ্য ব্যাধিতে। এ বিষয়ে দুদিন দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক আজাদীতে। ১০ই এপ্রিল ‘ভেজাল বেশি –অভিযান কম, স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফুটপাত থেকে শুরু করে অভিজাত হোটেল বা রেস্টুরেন্ট সবখানে ভেজাল খাবার। চাল ডাল আটা ময়দাসহ এমনকি বিভিন্ন নামী দামি ব্র্যান্ডের পণ্যও ভেজালমুক্ত নয়। চালে পাথর কিংবা বালির মিশ্রণ এটি যেনো স্বাভাবিক ঘটনা। এছাড়া টেক্সটাইলের কাপড়ের রং ও ফ্লেভার মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে জুস, আইসক্রিম, মিষ্টি, পাউরুটি, বিস্কুট দই, ললিপপ, চকোলেট এবং কেক। এমনকি শিশু খাদ্য গুড়ো দুধেও রয়েছে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান। এর বাইরে নিত্যপ্রয়োজনীয় শাক সবজি, ফলমূল ও মাছ তরতাজা রাখতে ফরমালিন মেশানো হচ্ছে। এছাড়া বিষাক্ত ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে পাকানো হচ্ছে কলা, আনারস। খাদ্যদ্রব্যে ভেজালের এসব কাজ কারবার চললেও জোরালো কোন অভিযান নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাদ্যে ভেজাল বন্ধে প্রশাসন মাঝে মধ্যে ঝটিকা অভিযান চালায়। নিয়মিত অভিযান না চালানোর কারণে খাদ্যে ভেজাল দেয়ার সাথে জড়িত চক্রটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে পারছে না সরকার।

সরকারের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত ‘খাদ্যদ্রব্যে রাসায়নিক দূষণ ও জীবাণু সংক্রমণবিষয়ক সমীক্ষা’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে শহরের প্রায় ৯০ শতাংশ পথখাবারেই মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর জীবাণু পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে বেশিরভাগ স্ট্রিট ফুড বা পথখাবার স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে তৈরি করা হয় না। এসব খাবার স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর। বাজারে চর্ব্য, চৌষ্য, লেহ্য এমন পণ্য পাওয়া কঠিন যেখানে ভেজাল ও বিষাক্ত উপাদান নেই। ভেজাল পণ্যে আক্রান্ত হয়ে ওষুধ খেলে সেখানেও ভেজাল। দেশজুড়ে অবাধে বিক্রি হচ্ছে নিম্নমানের নকল ও ভেজাল ওষুধ। যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রস্তুতকারক, প্রক্রিয়াজাতকারক, সরবরাহকারী সবাই এই ভেজাল প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। ক্ষেত থেকে শাকসবজি তুলে অপরিষ্কার নালা–ডোবায় ধোয়া হচ্ছে। ফলে পানিতে থাকা জীবাণু শাকসবজিতেও ছড়িয়ে পড়ছে। পোলট্রিসহ পশু মোটাজাতকরণে অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াও ব্যবহার করা হচ্ছে স্টেরয়েড জাতীয় হরমোন। মাংস ও দুধের মাধ্যমে তা কোনো না কোনোভাবে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এসব এতোই প্রকাশ্যে চলছে যে যার কারণে জনগণের প্রশ্ন : ভেজালের এই দৌরাত্ম্য কি চলতেই থাকবে?

মাঝে মধ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান চালালে হবে না, নিয়মিতভাবে দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা করতে হবে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী খাদ্য নিরাপদ আইন ২০১৩ করা হয়েছে। এ আইনে নিরাপদ খাদ্য উপদেষ্টা কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হলেও এ কাউন্সিলের কোনো কার্যক্রম চাক্ষুস হয় না। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমও চোখে পড়ে না। ধারণা করা হচ্ছে, উচ্চ আদালতের এসব নির্দেশনা না মানায় অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ভেজাল মেশাতে উৎসাহিত হচ্ছে; হয়ে উঠেছে বেপরোয়া। খাদ্যে ভেজাল রোধে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের দেওয়া এক রায়ে খাদ্যে ভেজাল পরীক্ষার জন্য প্রতিটি জেলা ও মহানগরে খাদ্য বিশ্লেষক ও পরিদর্শক নিয়োগের নির্দেশ আজও কার্যকর হয়নি। তবে আইন প্রয়োগ করে এ ক্ষেত্রে শতভাগ সুফল পাওয়া যাবে না। এ জন্য দরকার সমন্বিত উদ্যোগ। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও একযোগে কাজ করতে হবে। ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়াতেও উদ্যোগ নিতে হবে ভোক্তা সংগঠনগুলোকে। নকল ভেজালের দৈত্যকে ঠেকাতে আইনের পাশাপাশি জনসচেতনতার গুরুত্ব অনেক বেশি।

Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031