নাম টিম রিবুট। দলটি নতুন। তবে তিন তরুণের সৃষ্টি এই দলের আছে সীমাহীন স্বপ্ন আর আত্মবিশ্বাস। তারা এখন পর্যন্ত তৈরি করেছেন দুটি গেম। বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা থেকে গেম ‘ডিটেকটিভ দ্য গেম’ টিম রিবুটেরই সৃষ্টি। শুরুটা তাদের ‘ফ্লাই’ নির্মাণ করে। ব্র্যাকের জন্য তৈরি করছেন যক্ষ্মা সচেতনতা বিষয়ক গেম ‘প্রিভেন্ট টিউবারকোলোসিস’। কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের তরুণ গেম ডেভেলপারদের একটি কমিউনিটি তৈরি করার জন্য।

বড় কিছু করতে হলে বড় স্বপ্ন দেখতে হয়। সেই বড় স্বপ্নে বিভোর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তিন তরুণ। স্বপ্ন তাদের গেম ডেভেলপমেন্টে বাংলাদেশকে একটি সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। গেম তৈরি শুরু করেছেন খুব বেশিদিন হয়নি। ইতিমধ্যে তাদের তৈরি গেমসগুলো বেশ আলোচনায় এসেছে। পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন দেশের প্রযুক্তির বড় বড় বাঘরাও।

তরুণদের নাম জিসান হায়দার জয়, রেজাউল হাসান ইভান, মো. এমদাদুল হক। তিনজনই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র।

গেমস তৈরিতে আগ্রহ কেন? তাদের চটজলদি উত্তর, গেম ডেভেলপমেন্টের ওপর আগ্রহের জন্ম হয় একটি সেমিনারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। আগ্রহ জন্ম নিতে দেরি নেই, গেম ডেভেলপমেন্টের নেশায় পেয়ে বসে তিন জনকেই। ইউটিউব ও অনলাইনের বিভিন্ন ওয়েবসাইটকে শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করে চলে তাদের গেম নির্মাণ প্রশিক্ষণ। তারা অভিমান করেই বলেন, প্রায় সবাই অ্যান্ড্রয়েড গেম খেললেও আমাদের দেশে এই শিল্পের প্রতি ছাত্রদের আগ্রহী করে তুলতে কোনও উদ্যোগ নেই।

নেই কোনও গেম ডেভেলপিং কোর্সও। তবে গেম ডেভেলপমেন্টে তাদের আগ্রহ দেখে ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদেরকে ‘সেন্টার ফর কগনেটিভ স্কিল এনহ্যান্সমেন্ট’ ল্যাবটির দরজা খুলে দেন। ওই ল্যাবেই জিসান-এমদাদ-ইভান কাজ করেন দিন-রাত। এমদাদ বলেন, যে ল্যাব নিয়ম অনুযায়ী বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বিকাল ৫টায়, সেটা আমাদের জন্য খোলা থাকতো রাত ১০টা পর্যন্ত।

শেখার পর তিনে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন গেম ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির নাম ‘টিম রিবুট’। দলের নামটির পেছনেও আছে হার না মানার প্রত্যয়। এমদাদুল হক বলেন, আমরা হেরে গেলে থেমে যাই না আবার নতুন করে শুরু করি। তাই আমাদের নাম ‘টিম রিবুট’।

সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এখন পর্যন্ত তারা তৈরি করেছেন দুটি গেম। দলটির প্রথম গেমের নাম ‘ফ্লাই’। এক মাসের চেষ্টায় তিনজন এই গেমটি তৈরি করেন। এটি একটি ক্যাজুয়াল গেম। চলতি বছরের ৫ অক্টোবর গেমটি গুগল প্লে-স্টোরে পাবলিশ করেন তারা। এই সময়ের মধ্যে ৫ হাজারবার ইন্সটল হয়েছে। ব্যবহারকারীদের রিভিউতেও ভালো নম্বর পেয়েছে ফ্লাই। ২৭৭ জনের রিভিউতে গেমটি পেয়েছে পাঁচে গড়ে ৪.৬। ২৩১ জনই এই গেমকে পাঁচে ৫ দিয়েছেন। ফ্লাইকে নিয়মিত আপডেট করার পরিকল্পনা আছে টিম রিবুটের।

দ্বিতীয় গেমের নাম ‘ডিটেকটিভ দ্য গেম’। চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া তাদের অ্যানিমেটেড সিনেমা ‘ডিটেকটিভ’ থেকে গেম বানানোর দায়িত্ব দেয় এই দলকে। গেমটি তৈরি করতে টিম রিবুটের সময় লেগেছে ৬ মাস। এই গেমটি টিম রিবুটের কাছে বিশেষ কিছু; কারণ বাংলাদেশে এই প্রথম কোনও অ্যানিমেটেড সিনেমার জন্য গেম তৈরি হলো। গেমটি গুগল প্লে-স্টোরে ছাপা হয়েছে চলতি মাসের ৩ তারিখে। মাত্র ৮ দিনের মাথায় গেমটি ১ থেকে ৫ হাজারবারের মতো ডাউনলোড হয়েছে বলে জানা গেছে গুগল প্লে-স্টোর থেকে।

ইচ্ছে তাদের অন্তত ১০ লাখ বার ডাউনলোড হয় এমন গেম তৈরি করার। এমদাদ আত্মবিশ্বাসী, টিম রিবুটের গেম একদিন এই মাইলস্টোন ছোঁবেই। টিম রিবুট কেবল গেম তৈরি করেই থেমে নেই। কাজ করছেন গেম ডেভেলপারের একটি কমিউনিটি তৈরি করা। সেই লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার আয়োজন করছেন। সেখান থেকে আগ্রহী তরুণরা তাদের সঙ্গে একটি ফেসবুক গ্রুপে যুক্ত হচ্ছেন। যেখানে নতুন ডেভেলপারদের যে কোনও সমস্যার সমাধান দেন তারা। এমদাদ মনে করেন, একে অপরের জ্ঞান শেয়ার করে এক দিন আমাদের দেশ থেকে বের হবে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সব গেম।

কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন ইতিমধ্যে। মানুষের মধ্যে যক্ষ্মার সচেতনতা বাড়াতের তাদের ‘প্রিভেন্ট টিউবারকোলোসিস’ একটি গেমের ধারণা ২০১৫ সালে ব্র্যাকাথন প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়। গেমটি নির্মাণের জন্য ব্র্যাক দলটিকে পূর্ণ সহযোগিতা করছে। এমদাদ আশা প্রকাশ করেন, এই গেমটি খেলার ছলে মানুষের মনে যক্ষ্মা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি করবে। ২০১৬ সালে এমদাদ-জিসান ও ইভানের প্রকল্প নাসা স্পেস অ্যাপ চ্যালেঞ্জে ‘ওপেন ইনোভেশন’ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।

Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031