‘ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায়ের তথ্য আমরা পেয়েছি। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রথমে সখ্যতা তৈরি করতেন হেলেনা জাহাঙ্গীর, এরপর ব্ল্যাকমেইল করে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতেন তিনি। আজ শনিবার দুপুরে উত্তরা র‌্যাব সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। তিনি বলেন,  এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘হেলেনা সুনির্দিষ্ট একজন ব্যক্তির জন্য থেমে থাকেননি। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে তার। উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যাকেই প্রয়োজন হয়েছে তাকে তিনি ঘায়েল করেছেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলেছেন এবং সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছেন শুধু উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। আমাদের মামলার কারণ এটাই। সে রাষ্ট্রের ব্যক্তিদের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেছে যা তাদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে, জনগণের মধ্যেও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’

শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ‘আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি মনে করেন এই মামলাটির র‌্যাব তদন্ত করবে তাহলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে আমরা আবেদন করব। তবে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে হবে। হেলেনা জাহাঙ্গীরের স্বামী ১৯৯০ সাল থেকে গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে অন্যদের সঙ্গে পার্টনারশিপের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করে এখন পর্যন্ত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি।’তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি গত দুই বছরে বিভিন্ন মাধ্যম এবং টেলিভিশনে চাকরি দেওয়ার কথা বলে, এজেন্সি দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে বিভিন্ন পরিমাণ টাকা আদায় করতেন। কারও কাছ থেকে ১০ হাজার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা, আবার কারও কাছ থেকে এক লাখ টাকা নিয়েছেন বলে আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। কী কারণে টাকা নিয়েছেন এবং কী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে- এ বিষয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীর কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।’

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক বলেন, ‘বাসায় এবং অফিসে যে পরিমাণ ভাউচার পাওয়া গেছে তা এখনো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। জয়যাত্রা টেলিভিশনের আইডি কার্ড ব্যবহার করে অনেক প্রতিনিধিও এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।’

হেলেনা জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘তার ১৫ থেকে ১৬টি ফ্ল্যাট রয়েছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে তিনি জড়িত। বিভিন্ন সময় চাঁদাবাজি কিংবা ব্ল্যাকমেইল করে আদায় করা টাকাগুলো তিনি ফাউন্ডেশনের কাজে লাগাতেন। সুনামগঞ্জে তিনি ত্রাণ বিতরণ করায় স্থানীয়রা তাকে পল্লী মাতা উপাধি দিয়েছেন। ফাউন্ডেশনের নামে প্রবাসীদের কাছ থেকে অনেক টাকা এনেছেন। এগুলো কী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।’

জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা গেছে, ফ্ল্যাট কিংবা গাড়ির সংখ্যা কতগুলো সে বিষয়ে প্রকৃত কোনো তথ্য আমাদের দিতে পারেননি। কখনো ৬টি গাড়ি, কখনো ৮ গাড়ির কথা উল্লেখ করেছে হেলেনা। এসব বিষয়ে যারা তদন্ত করবেন তারা খতিয়ে দেখবেন। তার আয়ের উৎস সম্পর্কে সিআইডি কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশন এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করেন খন্দকার আল মঈন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি বক্তব্য উল্লেখ করে খন্দকার আল আমিন বলেন, ‘বক্তব্য খুবই উদ্বেগজনক। কাউকে এভাবে হেয় প্রতিপন্নভাবে কথা বলা সমীচীন নয়।’

হেলেনার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর ব্যাপারে ‌র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হেলেনা জাহাঙ্গীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যাচার, অপপ্রচার, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য করে অপপ্রচার এসব বিষয় হচ্ছে তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ। আর আমাদেরও কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল যার পরিপ্রেক্ষিতে হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। তার বাসায় অভিযান পরিচালনা করে মাদক, ওয়াকিটকি, চামড়া, ক্যাসিনো সরঞ্জাম উদ্ধার করি। হেলেনা জাহাঙ্গীর আইপি টিভি জয়যাত্রা কার্যক্রম ছিল সম্পূর্ণ একটি স্যাটেলাইট চ্যানেলের মত। যার কোনো বৈধ সম্প্রচারের অনুমোদন ছিল না। জিজ্ঞাসাবাদে হেলেনা জানিয়েছেন, শিগগিরই তিনি এটা অনুমোদন পেয়ে যেতেন। অনুমোদন না থাকায় বিটিআরসি সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় এবং আমরা মালামাল জব্দ করে মামলা করেছি।’

গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে র‌্যাব। পরে মিরপুরে হেলেনা জাহাঙ্গীরের মালিকানাধীন জয়যাত্রা আইপিটিভির কার্যালয় এবং জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন ভবনেও অভিযান চালানো হয়।

গতকাল শুক্রবার বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করা হয়। গুলশান থানার মামলায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে বিচারক তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

গত কয়েক বছর ধরে আলোচিত-সমালোচিত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নারী উদ্যোক্তা হেলেনা জাহাঙ্গীর। সম্প্রতি ‘আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামে একটি সংগঠনের পোস্টারকে ঘিরে বিতর্কিত হন। এর জেরে আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপকমিটির সদস্যপদ হারান তিনি।

Share Now
September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930