বাংলাদেশের অবস্থান ১৫তম ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-এর দুর্নীতির ধারণাসূচকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় । গতবারের থেকে এবার দুই ধাপ উন্নতি হয়েছে। গতবার ছিল ১৩তম অবস্থানে। দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ১ পয়েন্ট বেড়ে ২৬ হয়েছে। এতে দুর্নীতির ধারণাসূচক (করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স বা সিপিআই) ২০১৬ অনুযায়ী সূচকের শূন্য থেকে ১০০ এর স্কেলে বাংলাদেশের এই স্কোর। জার্মানির বার্লিনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান টিআইয়ের প্রকাশ করা দুর্নীতির ধারণাসূচক ২০১৬-এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সবচেয়ে বেশি ৯০ স্কোর করে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে আছে ডেনমার্ক ও নিউজিল্যান্ড। আর ১০ স্কোর করে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে রয়েছে সোমালিয়া। গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিতে মাইডাস সেন্টারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রতিবেদনের এসব তথ্য তুলে ধরেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বছর এই স্কোর পেয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে তালিকায় নিম্নক্রম অনুযায়ী পঞ্চদশ অবস্থানে সম্মিলিতভাবে আরো রয়েছে ক্যামেরুন, গাম্বিয়া, কেনিয়া, মাদাগাস্কার ও নিকারাগুয়া। এ বছর ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৫তম। তালিকায় নিম্নক্রম অনুযায়ী ১৭৬ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫তম। সূচকে ৪৩ স্কোরকে বৈশ্বিক গড় স্কোর বিবেচনা করা হয়। সেই হিসেবে ২০১৬ সালে দুর্নীতির ব্যাপকতা উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। ২০১৫ সালের তুলনায় দুর্নীতির সূচকে ২০১৬ সালে স্কোরে ১ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ঊর্ধ্বক্রম অনুসারে ৬ ধাপ নিচে নেমেছে। নিম্নক্রম অনুযায়ী অবস্থান দুই ধাপ এগিয়েছে।

ধারণাসূচক বিশ্লেষণ করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের স্কোর বাড়া কিংবা অবস্থানে অগ্রগতি দেখে বলা মুশকিল দুর্নীতি বেড়েছে না কমেছে। তিনি বলেন, যেসব দেশ ৪৩ বা তার বেশি স্কোর পায়, ধারণা করা হয়, সেসব দেশ মধ্যম পর্যায়ে দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। কিন্তু ধারণাসূচকে দেখা যায়, ৬২ শতাংশের বেশি দেশের স্কোর ৪৩ বা তার নিচে। তিনি বলেন, যেসব দেশ শীর্ষ অবস্থানে আছে, তারাও শতভাগ স্কোর করতে পারেনি। সে কারণে বলা যায়, এখনো বিশ্বব্যাপী দুর্নীতির বিস্তার আছে। বিশ্বব্যাংকসহ ১৩টি আন্তর্জাতিক জরিপ থেকে নেয়া তথ্যের ভিত্তিতে টিআই দুর্নীতির এই ধারণাসূচক তৈরি করে। শূন্য থেকে ১০০ নম্বরের মধ্যে স্কোর তৈরি করা হয়। এবারের শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ সোমালিয়া আগের বছরও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ছিল। আর এবারের সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় শীর্ষে থাকা ডেনমার্ক এককভাবে গত বছর শীর্ষে ছিল। এবারের শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে আরো আছে দক্ষিণ সুদান, উত্তর কোরিয়া, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন, সুদান, আফগানিস্তান, ভেনেজুয়েলা ও ইরাক। আর কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় ডেনমার্ক ও নিউজিল্যান্ড ছাড়াও আছে ফিনল্যান্ড, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, কানাডা, জার্মানি, লুক্সেমবার্গ ও যুক্তরাজ্য। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে মোট ১৭৬টি দেশের মধ্যে ভালো থেকে খারাপের দিকে ক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৫তম। গতবার ১৬৮টি দেশের মধ্যে ভালো থেকে খারাপের দিক অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩৯তম। সূচকের ১০০ মানদণ্ডের মধ্যে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের স্কোর বা নম্বর ২৬। আগেরবার এটা ছিল ২৫।
২০১৫ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩তম। ২০১৪ সালে ছিল ১৪তম, ২০১৩ সালে ছিল ১৬তম এবং ২০১২ সালে ১৩তম, ২০১১ সালে ১৩তম, ২০১০ সালে ১২তম, ২০০৯ সালে ১৩তম, ২০০৮ সালে ১০তম, ২০০৭ সালে ৭তম, ২০০৬ সালে তৃতীয় স্থানে ছিল। এবারের সূচক অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ভুটান। দেশটির স্কোর ৬৫। ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী অবস্থান ২৭। আর ১৫ স্কোর পেয়ে সূচকে ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী ১৬৯তম অবস্থান আফগানিস্তান। সূচকে ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে যথাক্রমে ৪০ স্কোর নিয়ে ৭৯তম ভারত, এরপরে ৩৬ স্কোর পেয়ে ৯৫তম যৌথভাবে রয়েছে মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা, ৩২ স্কোর নিয়ে ১১৬তম পাকিস্তান, ২৯ স্কোর নিয়ে ১৩১তম নেপাল।
আইনি প্রতিষ্ঠান সম্ভাবনায় ভালো হওয়ায় সে জন্য পয়েন্ট বেড়েছে বলে সংস্থাটি মনে করে। তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। দুর্নীতির এই ফলাফলের কারণ তুলে ধরে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণে ঘাটতি রয়েছে। ক্ষমতায় থাকলে সম্পদ বাড়ে, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়, নিজদের স্বার্থের ওপরে ওঠে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকারিতায় এবং স্বাধীনতায় ঘাটতি রয়েছে এবং গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ চাপে রয়েছে। কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিষয় উঠলে অস্বীকার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।  দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রত্যাশিত পর্যায়ে দুদকের দায়িত্ব পালনে ঘাটতি রয়েছে। নেতৃত্বের গুণাবলী ও জনবলে ঘাটতি রয়েছে এখানে। ফলে আশানুরূপ কাজ করতে পারছে না। তিনি আরো বলেন, আগের তুলনায় দুদক সক্রিয়। নতুন চিন্তা-ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। সফলতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করতে হবে। এটাই প্রত্যাশা আমাদের। টিআইবি চাপে আছে কি-না জানতে চাইলে উত্তরে তিনি বলেন, টিআইবি জন্ম থেকেই চাপে আছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে টিআইবি’র চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, দুর্নীতি নিয়ে আমরা কঠিন সংগ্রামের মধ্যে আছি। স্কোর এক বা দুই কম-বেশি বিষয় না। বৈশ্বিক গড় স্কোর থেকে আমরা অনেক দূরে আছি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন আরো শক্তিশালী ও জোরদার করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের দুই সদস্য এম হাফিজ উদ্দিন খান ও আলী ইমাম মজুমদার, টিআইবি’র উপনির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক (আউটরিচ ও কমিউনিকেশন) রিজওয়ান-উল আলম প্রমুখ।

Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031