চারাগাঁও ও বাগলী দেশের উত্তর-পূর্বঞ্চলের বড় শুল্কস্টেশন বড়ছড়া। ভারতের মেঘালয় থেকে এই শুল্ক স্টেশন দিয়ে এলসির মাধ্যমে কয়লা ও চুনা পাথর আমদানি করে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পায়। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে মার্চ মাস থেকে শুল্কবন্দরগুলো বন্ধ থাকায় সরকার প্রায় ১৫ কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে।

পাশাপাশি ব্যস্ততম তিনটি শুল্কস্টেশনে প্রায় ৮০০ আমদানিকারক এবং ৫০ হাজার শ্রমিক উপার্জনের উৎস খুঁজে পেতো। সেখান চারপাশে এখন সুনসান নিরবতা। মানবেতর জীবন যাপন করছে বন্দরের সঙ্গে জড়িত ২০টি গ্রামের শ্রমিক।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা সীমান্তের উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের বড়ছড়া, বাগলী, ছাড়াগাঁও তিনটি শুল্ক বন্দর এলাকা ঘুরে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

হাওরগুলো পানিতে ভরপুর থাকায় জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না পর্যাপ্ত মাছ। এখানকার শ্রমজীবী মানুষদের কয়লা, চুনাপাথর পরিবহনসহ কৃষি ও মাছ ধরা ছাড়া বিকল্প কর্মসংস্থানের উৎস না থাকায় দরিদ্র হাওরবাসী পড়েছেন জীবন ও জীবিকার গভীর সংকটে। করোনা যেনো তাদের জীবিকায় একরাশ কালো মেঘ ছুঁয়ে দিয়েছে। কাজের সন্ধানে শহরে ছুটছেন অনেকেই।

বড়ছড়া-চারাগাঁও শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, তিন শুল্কবন্দর চালু থাকলে মাসে দেড় কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব আদায় হয়। গত সাত মাস করোনার কারণে বন্দর বন্ধ থাকায় ১৫ কোটি টাকার মতো রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। আমদানি চালু হবে শুনেছি, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।

ট্যাকেরঘাট বড়ছড়ার কয়লা চুনাপাথর পরিবহন শ্রমিক মনির হোসেন জানান, কাজের খোঁজে শহরে গিয়ে কাজ নেই। কাজের চেয়ে দ্বিগুণ মানুষ। ঋণ করে কাজের উদ্দেশে শহরে গিয়ে কাজ না পেয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছি। এখন ঋণের চাপ অন্যদিকে পেটের ক্ষুধা। তিনটি বন্দর চালু হলে জীবন বাচাঁনো সহজ হতো। নাই জীবন বাচাঁনোই দায় হয়ে পড়বে।

টাংগুয়ার হাওরের চিলাইন তাহিরপুর গ্রামের মৎস্যজীবী আরিফুল মিয়া বলেন, হাওরে মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞা থাকলেও দিনরাত হাওরে জাল ফেলে ৩০০ টাকার মাছও ধরা যায় না। প্রতিটি নৌকায় মাছ ধরতে দুইজন জেলের দরকার হয়। এ রকম আয়-রোজগার দিয়ে সংসার চলে না। তাই জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে ছেলে সন্তান নিয়ে কাজের খোঁজে শহরে যেতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু সেখানেও কাজ নেই। তাই বাড়িতেই আছি খেয়ে না খেয়ে।

তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের সদস্য সচিব রাজেশ তালুকদার বলেন, মেঘালয়ে ৩২ লাখ টন উত্তোলিত কয়লাও রয়েছে। এর মধ্যে ভারতের ন্যাশনাল গ্রিণ ট্রাইব্যুনাল মার্চের প্রথম সপ্তাহে মেঘালয়ের দুই লাখ টন উত্তোলিত কয়লা মৌখিক চালানের ভিত্তিতে রপ্তানি করার আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু করোনার কারণে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় এই কয়লা আসেনি। এ কারণে কেবল শ্রমিকরা নয়, আমদানিকারকরাও আর্থিক ক্ষতি শিকার হচ্ছেন।

তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আবুল খায়ের বলেন, আমদানিকারকরাও ব্যবসা বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন। নতুন করে ব্যবসা হচ্ছে না। কয়লা-পাথরের যে বাকি পড়েছে সেগুলোও তুলতে পারছে না। ঋণগ্রস্ত আমদানিকারকরা অন্য ব্যবসা খুঁজছেন। তাও করতে পারছেন না।

উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান খসরুল আলম জানান, করোনা ও আইনি জটিলতায় তাহিরপুর সীমান্তের কয়লা শুল্ক স্টেশনগুলো বন্ধ রয়েছে।

তিনি বলেন, খেটে খাওয়া মানুষজন মরা পাথর ও কয়লা উত্তোলন করতে না পারায় অনেকেই পেটের দায়ে শহরের দিকে ছুটে যাচ্ছেন।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, সীমান্ত নদী যাদুকাটায় বালু পাথর উত্তোলনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নদী থেকে হাত বা ঠেলা জাল দিয়ে শ্রমিকরা কয়লা, লাকড়ি সংগ্রহ করতে নিষেধাজ্ঞা নেই। সম্প্রতি যাদুকাটা নদী এবং টেকেরঘাট এলাকায় ছড়াগুলো পরিদর্শন করে এখানকার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা হাওর এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিচ্ছি।

Share Now
July 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031