দেশের নিম্ন আদালতে মামলার বিভিন্ন কাজে একাধিক ব্যক্তিদের ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ প্রদান করতে হয় একজন বিচারপ্রার্থীকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মনে করে। যার পরিমাণ সর্বনিম্ন ২০ থেকে সর্বোচ্চ দশ লাখ টাকা পর্যন্ত। এসব কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একইসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট  এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান বিদ্যমান থাকায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। তাই নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান এককভাবে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করার সুপারিশ করেছে টিআইবি। এ ছাড়া বর্তমানে দেশের বিচারব্যবস্থা বিব্রত ও উৎকণ্ঠার মধ্যে আছে বলে মনে করে সংস্থাটি।

 নিম্ন আদালতের এসব অব্যবস্থাপনা দূর করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কেই ব্যবস্থা নিতে হবে। গতকাল টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অধস্তন আদালত ব্যবস্থা : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবি’র গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাম্মী লায়লা ইসলাম ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজমুল হুদা মিনা। এতে নিম্ন আদালত ব্যবস্থায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে বেশ কিছু সুপারিশও পেশ করেছে টিআইবি।
গবেষণায় বলা হয়েছে, দ্বৈত প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে। নিম্ন আদালত সংক্রান্ত কোনো উদ্যোগ বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে কিছু ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ বা দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রস্তাব সুপ্রিম কোর্ট নাকচ করে দেয়ার পরও মন্ত্রণালয় তা বাস্তবায়ন করেছে। উদাহরণ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও প্রেষণে কর্মরত বিচারিক কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণে যাওয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়। দ্বৈত প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেছে টিআইবি।
গবেষণায় বলা হয়, বিচার বিভাগ পৃথককরণের আগে বিচারকদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির বিষয়গুলো সংস্থাপন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিল। বর্তমানে তা আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। যা কিছু ক্ষেত্রে নিম্ন আদালত ব্যবস্থার কার্যক্রমে প্রভাব ফেলার ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক কারণে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন চাপে পড়তে হচ্ছে নিম্ন আদালতের বিচারকদের। এসব কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
গবেষণায় বলা হয়, একটি মামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ব্যক্তিদের ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ প্রদান করতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। মামলার ধরন, গুরুত্ব, বিবাদী বা আসামির সংখ্যা, কাজের অত্যাবশ্যকীয়তা, বিচারপ্রার্থীর সামর্থ্য ও এলাকার ওপর নির্ভর করে সর্বনিম্ন ২০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ দশ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেন করা হয়। এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে সাক্ষীর শুনানি, স্বাক্ষর করা, জেরার সময় যথাযথ ভূমিকা না রাখা, মামলা আপস বা প্রত্যাহার করার জন্য রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়; ওয়ারেন্ট কপি থানায় পাঠানো, ওকালতনামা শনাক্ত, বেইলবন্ড প্রদান, বিভিন্ন নথি উত্তোলন, আসামিকে খাবার বা কোনো সুবিধা দেয়ার জন্য কোর্ট পুলিশের অর্থ আদায়; রায় বা আদেশ (জামিন প্রদান, নিষেধাজ্ঞা জারি) প্রভাবিত করার জন্য; মামলার ফাইলিং (সিআর মামলার ক্ষেত্রে); সমন জারিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তবে অবৈধ লেনদেনের এই চিত্র সকল ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয় বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
সামপ্রতিক সময়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাকে নিয়ে উচ্চ আদালতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এর প্রভাব নিম্ন আদালতেও পড়ছে উল্লেখ করে টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি সুলতানা কামাল বলেন, নিম্ন আদালতে যে জবাবদিহিতা, যে আনুগত্য সেটা কার কাছে, সেটা নিয়ে কিন্তু সমস্যা আছে, অস্বচ্ছতা রয়েছে। ইদানীংকালের ঘটনার পরে আরো বেশি করে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিচার মামলা সংক্রান্ত অনেকক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি, ঘুষ ও বহির্ভূতভাবে লেনদেন রয়েছে। সাধারণ জনগণের উদ্বেগ, টিআইবির উদ্বেগ সেটাই শুধু নয়, এটা যারা বিচার ব্যবস্থায় শীর্ষে আছেন তাদেরও উদ্বেগ। আইন মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের নিম্ন আদালতের ওপর দ্বৈত প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতিও মামলার দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ বলে জানান নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
নিম্ন আদালতসমূহের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও শুদ্ধাচার চর্চা নিশ্চিতকরণে ১৮ দফা সুপারিশ পেশ করা হয়। সুপারিশগুলো হলো: নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত; প্রযোজ্য ক্ষেত্রে যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন ও পুরোনো আইনের সংস্কার; যথাযথভাবে চাহিদা নিরূপণ সাপেক্ষে নিম্ন আদালতগুলোর জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত; নিম্ন আদালতসমূহের জন্য পর্যাপ্ত জনবল, অবকাঠামো, লজিস্টিকস ও আধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত; আদালত প্রাঙ্গণে বিচারপ্রার্থীদের জন্য বসার ব্যবস্থা; বিচারকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুততর; নিম্ন আদালতের সহায়ক কর্মচারীদের নিয়োগ স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত; রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবীদের নিয়োগ স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত; বিচারক এবং কর্মচারী ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। টিআইবি’র এ গবেষণা প্রতিবেদন তৈরিতে দেশের ১৮টি জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। গবেষণার আওতাভুক্ত জেলাগুলোর নিম্ন আদালতগুলোতে পর্যাপ্ত জনবলের অভাব। ৬২১টি আদালতে ১১৪ জন বিচারকের সাময়িক ঘাটতি এবং ৫৭৯ জন সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ শূন্য রয়েছে।
Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031