কত মা তার সন্তান হারাচ্ছেন। সড়কে মৃত্যু। আন্দোলন। নানা প্রতিশ্রুতি। বক্তব্য। তারপর আবার সবকিছু ফের একই রকম। কোনো কিছুই বদলায় না। সড়কে বন্ধ হয় না মৃত্যুর মিছিল।

কত মানুষ প্রতিদিন পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। এই  অসহায়ত্বের শেষ কোথায়, কবে কেউ জানে না। বন্ধ না হোক, অন্তত নিয়ন্ত্রণে আসুক সড়ক দুর্ঘটনা এ দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। যেন সড়কে মৃত্যুর মিছিল চলছে, চলবে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণার তথ্য অনুসারে, গত ১লা আগস্ট থেকে ৩০শে আগস্ট পর্যন্ত এক মাসে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩৯৬ টি। মারা গেছেন ৪৭২ জন, আহত হয়েছে ৮৯৪ জন। এছাড়া একই মাসে ট্রেনে কাটা পড়ে দুর্ঘটনার সংখ্যা ১৬ টি। ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা গেছে ১৪ জন।
সাধারণত ঈদ যাত্রার সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে সড়ক। এ সময় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হন পথচারীরা। আবার বাস ও মোটরসাইকেলে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। এআরআইয়ের গবেষণার তথ্য অনুসারে, গত ঈদুল ফিতরে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে ১৭২টি। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১৫৪ জন। এর মধ্যে ঈদের আগের সাত দিনে ৫০টি দুর্ঘটনা ঘটে। আর ঈদের দিন থেকে পরের আট দিনে দুর্ঘটনার সংখ্যা ১২২টি। ঈদের আগে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ৭২ জনের। পরের আট দিনে প্রাণ হারান দ্বিগুণ, ১৪৪ জন। এবারের ঈদুল আজহার চিত্রও এমনই। ঈদের ফিরতি যাত্রা শুরু হওয়ার পর এক দিনেই সড়কে ২৫ জনের প্রাণ ঝরেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদের আগে যানজটের কারণে সড়ক-মহাসড়কে যানবাহনের গতি কম থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও বেশি থাকে। এ জন্য যাত্রী পরিবহন বেশি হলেও দুর্ঘটনার হার কম। কিন্তু ঈদের ফিরতি যাত্রায় সড়ক অনেকটাই ফাঁকা থাকার কারণে চালকরা ইচ্ছেমতো গাড়ির গতি তোলেন। দ্রুত যাত্রী নামিয়ে পুনরায় যাত্রী ধরার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন।

এআরআইয়ের তথ্য বলছে, ২০১৬ থেকে গত ঈদুল ফিতর পর্যন্ত সাতটি ঈদ উদ্‌যাপিত হয়েছে। এসব ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৬১৩ জন। প্রতি ঈদের আগে-পরের সময়টাতে গড়ে প্রাণ হারান ২৩০ জন। অবশ্য যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ঈদের আগে-পরের ১৩ দিনে গড়ে ৩০০ মানুষের প্রাণহানি হয়।

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ এর (নিসচা) এক প্রতিবেদন বলছে, এবারে পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে নয় দিনে সারা দেশে দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৩৫টি। এতে নিহত হয়েছে ১৮৫ জন এবং আহত হয়েছে ৩৫৫ জন। এর মধ্যে শুধু সড়কেই ১৩০টি দুর্ঘটনায় ১৮০ জন নিহত ও ৩৪৪ জন আহত হয়েছে।

এআরআইয়ের গবেষক কাজী সাইফুন নেওয়াজ এ বিষয়ে মানবজমিনকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এখানে অনেকগুলো কারণ কাজ করছে। এবং অনেকগুলো কারণ জড়িত আছে। শুধুমাত্র করণীয় বিষয়গুলো নিয়ে ১১১ সুপারিশমালা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ জাতীয় সহযোগীতা কাউন্সিলের কাছে ইতোমধ্যে পেশ করা হয়েছে। এই কমিটির যে সুপারিশগুলো আমরা মনে করি এই সুপারিশ যদি বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়কে শৃঙ্খলা দুটিই আমরা অনেক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারবো।    

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হলো বহুমুখি। অনেকগুলো কারণ। এখন সরকারকে যেটা করতে হবে সেটা হলো, সমস্যার উৎসটাকে চিহিৃত করে বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। অনেকগুলো কাজ করতে হবে সমন্বিতভাবে। এখানে এক্সপার্টদের কাজে লাগাতে হবে। বিআরটিএর কাজ করতে হবে। মালিক শ্রমিক সংগঠনগুলোর কাজ করতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও এরসঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সেটি সরকারের নেই। সরকার মনেই করে না যে এটি একটি বড় সমস্যা। এবং এই সমস্যা সমাধান করা দরকার। যতদিন পর্যন্ত সরকার মনে না করবে ততোদিন পর্যন্ত এর সমাধান হবে না। কাজেই সমাধানটা সরকারকেই করতে হবে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত যে ড্যাটা আমরা দিয়ে থাকি এটা আসলে সঠিক নয়। এটাকে একটি প্রতিকি চিত্র বলা যায়। সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিটি ঘটনা যেমন গণমাধ্যমে আসে না। একইভাবে প্রতিটি ঘটনা আমরা তুলে ধরতে পারি না। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত এবং নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি। তবে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা অনেক গভীর। অনেক বেশি। বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থ্যার মতে সড়কে প্রতি বছর প্রায় ২৫ হাজার মানুষের প্রাণহানী ঘটে। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও একই কথা বলছে। মোটাদাগে বলতে গেলে, আইনের কঠরতম প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজ করতে হবে। এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাকে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরী।

Share Now
June 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930