জোড়া খুন মামলার রহস্যের জট খুলেছে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে । ঘটনার পাঁচ দিনের মধ্যে জেলা ডিবি পুলিশ ক্লু-লেস মামলাটির রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে। ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে বউ-শ্বাশুরিকে হত্যা করা হয়েছে বলে আদালতে গ্রেপ্তার দুইজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার হবিগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শম্পা জাহানের আদালতে অভিযুক্ত জাকারিয়া আহমেদ শুভ ও আবু তালেব হোসেন এ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

জাকারিয়া আহমেদ শুভ উপজেলার ভুবিরবাগ গ্রামের হাফিজুর রহমান ও আবু তালেব হোসেন একই উপজেলার আমতৈল গ্রামের আমির হোসেনের পুত্র এবং নিহত গৃহবধূ রুমির পিতার বাড়ির পাশে।

আদালতের বরাত দিয়ে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা জানান, উপজেলার সাদুল্লাহপুর গ্রামের লন্ডন প্রবাসী আখলাছ চৌধুরীর পরিবারের লোকজনের বিভিন্ন বাজার হাটসহ দেখাশোনা করত তালেব হোসেন নামে ওই ব্যক্তি।

প্রেসব্রিফিংয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, জাকারিয়া আহমেদ শুভ প্রবাসীর সুন্দরী স্ত্রীকে ধর্ষণের জন্য গত ১১ মে বিভিন্ন রকম ফন্দি আটে। ওই দিন রুমির ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের একটি কাভার কিনে দেয়ার জন্য প্রবাসী আকলাক চৌধুরী গোলজার তার এক বন্ধুকে দায়িত্ব দেন। ওই বন্ধু সে দিন এলাকায় না থাকায় তার ছোট ভাই জয়কে দিয়ে কাভার কিনে পাঠান। তবে নতুন ক্রয় করা কাভারটি গৃহবধূ রুমির পছন্দ না হওয়ায় সেটি ফেরত দেন। এ সময় জয়ের সাথে রুমিদের বাড়িতে যান জাকারিয়া আহমেদ শুভ। কাভার নিয়ে ফেরত আসার পথে আবু তালেবের সাথে পরিচয় হয় জাকারিয়া আহমেদ শুভর। আর এই পরিচয়ের সূত্র ধরেই গৃহবধূ রুমি বেগমকে ধর্ষণের ফন্দি আটে শুভ ও তালেব। এরপর শুভ রুমির স্বামীর বাড়ির পাশের একটি সেতুর কাছে গিয়ে আবু তালেবকে বিভিন্ন ধরনের পর্নগ্রাফি ভিডিও দেখায়। আস্তে আস্তে পর্নগ্রাফি দেখে ধর্ষণে উদ্ধুদ্ধ হয় তালেব। এরপরই দুজনে মিলে ফন্দি আটে কীভাবে গৃহবধূ রুমি বেগমকে ধর্ষণ করা যায়। পরে শুভ, তালেব ও শুভর এক বন্ধু মিলে গত ১৩ মে ধর্ষণের জন্য তাদের বাড়িতে যাওয়ার দিনক্ষণ ঠিক করে। কিন্তু ওই দিন শুভর অন্য বন্ধুর ব্যক্তিগত কাজ থাকায় আসতে পারেনি।

পুলিশ সুপার বলেন, তার বন্ধু না আসলেও শুভ এবং তালেব ছুরি নিয়ে প্রবাসীর বাড়িতে যায়। প্রথমে তালেব প্রবাসীর বাড়ির গেইটে গিয়ে কড়া নাড়লে রুমির শ্বাশুড়ি মালা বেগম গেইট খুলে দেন। এ সময় তালেবের সাথে শুভ নামে ওই যুবককে বাড়িতে ঢুকতে মালা বেগম নিষেধ করেন। কিন্তু মালা বেগমের নিষেধ উপেক্ষা করে তাকে ধরে একটি কক্ষে নিয়ে যায়। এ সময় মালা বেগম চিৎকারের চেষ্টা করলে তাকে শুভ ছুরিকাঘাত করে। সাথে সাথে রুমি বেগম শ্বাশুড়িকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসলে তার বুকেও ছরিকাঘাত করে। রুমি বেগম দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসলে শুভ ও তালেব তাকে বারান্দায় উপর্যপরি ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। হত্যার পর আবু তালেব ওরফে তালেব হোসেন ও জাকারিয়া আহমেদ শুভ পালিয়ে যায়।

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রায় ৫ ঘণ্টা হবিগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিমের আদালত এ জবানবন্দি রেকর্ড করে। জবানবন্দির উপর বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৫টায় প্রেসব্রিফিং করেন হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা।

গত বুধবার দুপুরে জাকারিয়া আহমেদ শুভ ও আবু তালেব ওরফে তালেব হোসেনকে উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আউশকান্দি সিএনজি পাম্প এলাকা থেকে আটক করে পুলিশ। এ ঘটনায় ১৫ মে রাতে নিহত রুমির ভাই পল্লী চিকিৎসক নজরুল ইসলাম চৌধুরী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন। শুভ রহমান ও আবু তালেবকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বৃহস্পতিবার কারাগারে পাঠানো হয়।

এদিকে, মা ও স্ত্রী খুনের খবর পেয়ে লন্ডন থেকে দেশে ছুটে আসেন আখলাক চৌধুরী গুলজার। তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে আমার মা ও স্ত্রীকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

স্থানীয়রা জানায়, সাদলাপুর গ্রামের মৃত রাজা মিয়ার ছেলে আখলাক চৌধুরী গুলজার দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে বসবাস করছেন। দুই বছর আগে তিনি দেশে এসে নিজ গ্রামের কুয়েতপ্রবাসী সুজন চৌধুরীর মেয়ে রুমি বেগমকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর গুলজার ফের লন্ডন ফিরে গেলে তার বাড়িতে মা ও স্ত্রী থাকতেন।

প্রেস ব্রিফিংকালে উপস্থিত ছিলেন হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আ স ম শামছুর রহমান ভূইয়া, নবীগঞ্জ-বাহুবল সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার পারভেজ আলম চৌধুরী, সহকারী পুলিশ সুপার নাজিম উদ্দিন, ডিআই-১ মাহবুবুর রহমান, ডিবির ওসি শাহ আলমসহ পুলিশের কর্তকর্তারা।

Share Now
May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031